Writer:Akimul Sheikh
একটি ছোট মফস্বল শহরে বড় হওয়া মেয়ে সায়রা। রক্ষণশীল পরিবার আর সমাজের হাজারো চোখ রাঙানি ছিল তার প্রতিদিনের সঙ্গী। মেয়েদের কাজ শুধু রান্নাবান্না আর ঘরকন্না—এই প্রচলিত ধারণার মধ্যেই সায়রা স্বপ্ন দেখত নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার। সায়রার যখন স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষ, তখন তার বড় ভাই এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। পুরো পরিবারটি মানসিকভাবে তো বটেই, আর্থিকভাবেও ভেঙে পড়ে। আত্মীয়-স্বজনরা পরামর্শ দিতে শুরু করল সায়রার তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিতে, যাতে পরিবারের ওপর থেকে 'বোঝা' কমে।
কিন্তু সায়রা জানত, বিয়ে সমস্যার সমাধান নয়। সে তার বাবার পুরনো ভাঙাচোরা ল্যাপটপটি নিয়ে বসল। তার কাছে কোনো দামী কোর্স করার টাকা ছিল না, ছিল না কোনো মেন্টর। সায়রা শহরের একটি লাইব্রেরিতে গিয়ে ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করে ইউটিউবে গ্রাফিক ডিজাইনের ভিডিও দেখা শুরু করল। প্রথম ছয় মাস সে শুধু শিখেছে। পাড়া-পড়শিরা আড়ালে বলত, "মেয়েটা সারাদিন কম্পিউটারে কী জানি কুফরি করে!"
সে যখন প্রথম একটি আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খুলল, প্রথম তিন মাস সে কোনো কাজই পায়নি। শত শত আবেদন করেও যখন রিজেকশন আসছিল, সায়রা মাঝেমধ্যে মাঝরাতে একা কাঁদত। কিন্তু পরদিন সকালে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করত। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সায়রা মাত্র ৫ ডলারের একটি লোগো ডিজাইনের কাজ পায়। সেই ৫ ডলারের আনন্দ ছিল তার কাছে কোটি টাকার সমান। সে তার গ্রাহককে এত নিখুঁত কাজ দিল যে, সেই গ্রাহক তাকে আরও ১০টি কাজের অর্ডার দিলেন।
এরপর সায়রাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সে নিজেকে শুধু ডিজাইনে সীমাবদ্ধ রাখেনি, শিখল ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ইউআই/ইউএক্স ডিজাইন। সায়রা যখন বেশ ভালো আয় করা শুরু করল, তখন সে নিজের শহরে একটি ছোট 'আইটি ট্রেনিং সেন্টার' খোলার সিদ্ধান্ত নিল। সমাজের যারা একসময় তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত, তারাই এখন তাদের মেয়েদের সায়রার কাছে পাঠাতে শুরু করল কাজ শেখার জন্য।
সায়রা শুধু নিজে সফল হয়নি, সে তার এলাকার ৫০ জন বেকার তরুণ-তরুণীকে দক্ষ করে গড়ে তুলেছে যারা এখন ঘরে বসে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। যে মেয়েটিকে একসময় 'বোঝা' মনে করা হতো, সেই সায়রা এখন তার পুরো পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক উদ্যোক্তা।
গল্প থেকে শিক্ষা: সম্পদের অভাব অজুহাত নয় সায়রার কাছে দামী ক্যামেরা বা স্টুডিও ছিল না, ছিল শুধু শেখার প্রবল ইচ্ছা যা তাকে সফল বানিয়েছে।
যারা আপনার নিন্দা করে, তাদের উত্তর মুখে না দিয়ে নিজের কাজের মাধ্যমে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে যখন আপনি নিজের সাথে আরও দশজনকে টেনে তোলেন।
Fact: সায়রা আর শুধু এখন একজন ঘরকন্না নয়, তিনি হলেন বাংলাদেশের ইমরাজিনা ইসলাম (Emrazina Islam)।
তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত সফল নারী ফ্রিল্যান্সার এবং উদ্যোক্তা, কিন্তু তার শুরুটা ছিল সায়রার গল্পের মতোই অনেক কষ্টের।
ইচ্ছা থাকলে ছোট ঘর থেকেও বিশ্ব জয় করা সম্ভব।