#অক্ষরপ্রীতি_পরিবার_অনুগল্প_প্রতিযোগিতা_১৬ই_ডিসেম্বর
গল্পের নাম: #বৃষ্টি_ভেজা_তুমি
লেখনীতে: #আয়শা_সিদ্দিকা
সময়টা বর্ষাকাল । এই সময় বৃষ্টিতে ভেজার স্বাদ আস্বাদন করার মতো বিপরীতে আর কিছু থাকে বলে মনে হয় না ? যার সুন্দর একটা মন আছে তার বৃষ্টির পানিতে এলার্জি থাকলেও সে বৃষ্টিতে ভিজতে বাধ্য । বৃষ্টি কেবল একটা অনুভূতি নয় আলাদা ভালো লাগা যা প্রকৃতি ও সৃষ্টির সাথে সন্ধির মিলন মেলা । বৃষ্টির পানি হাত বাড়িয়ে আঙুলে স্পর্শ করলে গভীর এক অনুভূতির সাক্ষাৎ হয়। আর মেয়ে মানুষ মানেই বৃষ্টিবিলাসী। যারা বৃষ্টি পছন্দ করে না তাদের প্রত্যেকের পড়া উচিৎ হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টি বিলাস বই । তবে বৃষ্টির অনুভূতি বুঝবে ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই পশ্চিম আকাশে ঘনো কালো মেঘে ছেয়ে গেলো। মুহূর্তেই ঝম ঝম বৃষ্টি নামলো ধরনীতে– আকাশ যেন কোনো পূর্বসংকেত না দিয়েই খুলে দিল তার সব অভিমান। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো দৌড়াতে লাগল আশ্রয়ের খোঁজে । কোলাহল চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ।
অষ্টাদশী বৃষ্টি যেন আর ঘরে থাকতে পারলো না ? নাম যেমন বৃষ্টি তেমনই প্রকৃতির বৃষ্টির প্রতি আলাদা আকর্ষণ। বৃষ্টি আসবে অথচ সে ভিজবে না এমন হতেই পারে না।
বৃষ্টি ও তার ছোট বোন অনিমা মন ভরে আঙিনায় লাফিয়ে লাফিয়ে বৃষ্টিকে যেনো অভিনন্দন জানাচ্ছে । উঠানে রেডিওতে গান জুড়েছে_
" বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
পায়ে দিয়ে সোনার নুপুর ..."
একই তালে দুই বোন নৃত্য করছে । বলতে গেলে বৃষ্টি খুব সুন্দর নাচতে পারে । তালে তালে নাচের মুদ্রা পরিবর্তন করছে , আর উঠানে বসে হাফসা বেগম তার দুই নাতনির কান্ড কারখানা দেখছে । বেশ রসিক ও খোলা মনের মানুষ হাফসা বেগম ।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একে একে ভিজিয়ে দিচ্ছিল চুল, জামা, ভাবনা। চারপাশ ঝাপসা হয়ে এল, শব্দগুলোও যেন নরম হয়ে গেল। এই বৃষ্টি শুধু শরীর ভেজায় না , ভেতরের জমে থাকা ক্লান্তিটুকুও ধুয়ে নেয়। ভেজা মাটির স্পর্শে পুরো শরীর যেন শীতল হয়ে উঠল ! শব্দ, বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হালকা অনুভূত , যেন বৃষ্টি নতুন করে চিনিয়ে দিচ্ছে নিজের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে। বৃষ্টি থেমে গেলে সব আবার আগের মতোই হবে। কিন্তু এই ভেজা মুহূর্তটা চুপচাপ থেকে যাবে স্মৃতির পাতায়।
_
বৃষ্টিতে ভেজা নৃত্যরত রমণীকে দেখে বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ২৫ বছরের যুবকের বুকের ভেতর অদ্ভুদ দোলা খেলে গেলো । যা এতবছরেও কাওকে দেখে হয়নি । চলতে থাকা পা দুটো হটাৎ করেই যেনো মাটির সাথে আটকে গেলো । পা তোলার মতো শক্তি পাচ্ছে না । শক্ত বুকটা পাথরের মতোই ছিল এতদিন। কিন্তু এই মুহূর্তে, বৃষ্টির ফোঁটার মতোই হালকা এক অনুভূতি এসে পড়ল ভেতরে। নামহীন, না প্রেম, না আকাঙ্ক্ষা , শুধু গভীর এক নড়েচড়ে ওঠা। রমণীর চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল, সে তাকাল আকাশের দিকে। বৃষ্টি যেমন শব্দ না করে ভিজিয়ে দেয়, তেমনি সেই অনুভূতিও তাকে ভিজিয়ে দিল।
পেছন থেকে বিহান এসে ডাকতেই রোদ্দুর হকচকিয়ে গেলো । কিছুটা অস্বাভাবিক হলো বটে ।
বিহানের ডাকে ভিজতে থাকা দুই বোনে পেছনে ঘুরে তাকালো । হাফসা বেগম দ্রুত বেগে তার ছেলে কে ডাকলো ,
_ আইজান দেখে যা বিহান এসেছে । আমার নাতি এতদিন পরে বাড়ি ফিরেছে ।
একে একে সবাই ঘর থেকে বের হলো আর বৃষ্টি ও তার ছোট বোন নিপা এক দৌড়ে নিজেদের ওয়াশরুমে চলে গেলো । কেনোনা নিজের ভাই হলে দৌড়ে যেতো কিন্তু এখানে একজন অপরিচিত ছেলে আছে । যা এই ভেজা অবস্থায় যাওয়া সম্ভব নয় ।
কুশল বিনিময় করে বিহান তার বন্ধু রোদ্দুর কে পরিচয় করিয়ে দিয়ে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলো । অফিস ছুটি বলে ঘুরতে আসা , রোদ্দুর আর বিহান রুমমেট আবার বেস্ট ফ্রেন্ড তাই সঙ্গে নিয়ে এসেছে গ্রাম ঘুরতে ।
_
কেটে গেলো ৪ টা দিন । কখনও কখনও বৃষ্টি ও রোদ্দুরকে ঘুরতে নিয়ে গেছে গ্রামের আশে পাশে। বড় ভাইয়ের বন্ধু বড় ভাই বাজারে যাওয়ার আগে বলেছিল আশ পাশ থেকে যেনো ঘুরে আনে।
দুইজন পাশাপাশি হাঁটছে । অচেনা ছেলের সাথে হাঁটতে ও শরীর বার বার কেঁপে উঠছে অষ্টাদশী বৃষ্টির।
বিষয়টা রোদ্দুর বুঝতে পেড়ে স্বাভাবিক করার জন্য বলল ,
_ তোমার নাম যেনো কি ..?
_ বি..বৃষ্টি মহুয়ান।
_এই জন্যই তুমি বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করো বুঝি ?
কাপা কাপ কন্ঠে বৃষ্টি বলল ,
_ জানিনা ..।
_ একটা কথা কি জানো মেয়ে...?
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই রোদ্দুর আবারো বলল,
_বৃষ্টি জীবনে অনেক কিছু নিয়ে আসে । কারো জীবনে রঙিন করে দিতে , আবার নতুন অনুভূতি এনে দিতে বৃষ্টি একটি সেরা সৃষ্টি।
এভাবেই চলল প্রায় ৬ দিন । দুইজনের মধ্যে ভালই একটা ভাব হয়েছে । বৃষ্টির মনেও কোথাও জায়গা পেলো রোদ্দুর। অষ্টাদশী নানান বাহানায় রোদ্দুরের সাথে সময় কাটাতে চায় ।
সকাল সকাল এক ঘটক এসে উপস্থিত হলো , এক ভালো ঘর নিয়ে । যাতে বৃষ্টির বিয়ে দেয় । পরদিন শুক্রবার তাই পাত্র পক্ষ আসতে চাইলো । যেহেতু বিহান বড় ভাই এখনো আছে , শনিবারেই শহর মুখী হবে । তাই বৃষ্টির বাবা ও মত দিলো ।
শুক্রবার সকাল সকাল সবাই উপস্থিত হলো । কিন্তু বৃষ্টির মনে যে শ্রাবণ ধরছে সেটা কাওকে বোঝাতে পারছে না । অঝোর ধারায় কাদতে লাগলো । কেনো জানি বুকের ভেতর কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। এই বিয়ে মানতে পাচ্ছে না । আসলে যে বিয়ে মানতে পরছে না এমনটা নয় সে বিয়ের জায়গায় রোদ্দুরকে ব্যতীত অন্য কাওকে ভাবতে পারছে না ।
তার মা এসে একটা সুতির লাল শাড়ি পরিয়ে বসার ঘরে নিয়ে গেলো । বৃষ্টি তখন ও নিচের দিকে তাকিয়ে। সমান বসে থাকা রোদ্দুরের দৃষ্টি এক পলক আটকে গিয়েছে অষ্টাদশী শাড়ী পড়া চেহারায়। উষ্ণতায় হঠাৎ বুকের ভেতর একটা মোলায়েম অনুভূতি জন্ম নিল, কোনো তাড়াহুড়ো নেই ।
বৃষ্টির চোখ জোড়া ও যেনো তৃষ্ণার্ত কাকের মত রোদ্দুরে দেখতে চাইলো । নিজের চোখ দুটোকে সংবরণ করতে না পেরে সামনে তাকালো রোদ্দুরের দিকে । দুইজনের দৃষ্টির মিলন হতেই যেনো না বলা হাজারো কথা বলে ফেলল চোখের ভাষায় ।
বিহান বিষয়টা লক্ষ্য করলো । দেখার পুরো সময় বৃষ্টি নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল আর বার বার অসহায় চোখে রোদ্দুরের পানে তাকিয়েছে ।
রোদ্দুর বিষয়টা আগে জানলে হয়তো কিছু একটা করতে পারত । কিন্তু কি করবে ? বন্ধুকে বলবে যে সে তার বোনকে ভালবেসে ফেলেছে ? এতে তাদের সম্পর্কের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হবে । যা কখনোই রোদ্দুর চায় না ।বিয়ের দিন ঠিক করে ওনার চলে গেলো ।
এদিকে একা ঘরে বৃষ্টির কান্না দেখে বাইরে থেকে থমকে গিয়েছিল বিহান। দরজা ঠেলে কাছে যেতেই জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে বলছিল ,
_ ভাইয়া আমি এই বিয়ে করতে পারব না ? আমি একজনকে খুব ভালবাসি ভাইয়া ।
_ তুই কি রোদ্দুরকে ভালোবাসিস?
চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ালো বৃষ্টি ।
বৃষ্টির হ্যাঁ সূচক উত্তরে মুচকি হাসি দিয়ে বোনকে আঁকড়ে ধরলো ।
_তুই চিন্তা করিস না তোর ভাই থাকতে তোর খুশির বিরুদ্ধে কেউ তোকে জোর করতে পারবে না ।
___
এরপর ১ মাস পর ধুম ধাম করে বিয়ে হলো রোদ্দুর ও বৃষ্টির। সেইদিন বিহান বাবা মাকে বুঝিয়ে বলেছিল তাই ওনারা ও মেয়ের খুশির কথা ভেবে রোদ্দুরের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয় ।
এক বছর পর আবারও সেই বৃষ্টির মাঝে দাড়িয়ে আছে বৃষ্টি । শাড়ি পরে বৃষ্টিতে মনের আনন্দে ভিজতে নেমেছে ।
আর পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রোদ্দুর বৃষ্টি ভেজা তার একান্ত আপন বৃষ্টিকে দেখছে ।
কাছে এগিয়ে হাতে হাত ধরে পাশাপাশি দাড়ালো ।
তোমাকে আমি বৃষ্টিস্নাত এক বিকেলে দেখেছিলাম। সেইদিন আমার জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছি ।
তোমাকে ভালোবাসার মতো সুযোগ পেয়েছি ।
তুমি বৃষ্টি হয়ে আমার জীবনে ধরা দিলে এক সুন্দর ভালোবাসা হয়ে ।
সমাপ্ত...