Skip to Content

গল্প ফেলে আসা স্মৃতি

January 2, 2026 by
গল্প ফেলে আসা স্মৃতি
Mukto Vabuk
| No comments yet

#অক্ষরপ্রীতি_অনুগল্প_প্রতিযোগিতা_১৬ডিসেম্বর

#অনুগল্প

গল্প_ফেলে_আসা_স্মৃতি


লেখিকা_তানহা_চৌধুরী


সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। সময়ের নিয়মে সময় চলে যায় কিন্তু রেখে যায় কিছু স্মৃতি। কিছু ভালো কিছু খারাপ অতীত রয়ে যায় স্মৃতির পাতায়। স্মৃতির পাতায় দিনগুলো রয়ে যায় আমাদের মনের একটা কোণে। হুটহাট মুখে মুচকি হাঁসির মধ্যে ফেলে আসা দিনগুলো মনে পড়ে যায়। কি অদ্ভুত! তাই‌ না একসময়ের মধুময় দিনগুলো এখন মাত্রই হঠাৎ মনে পড়া স্মৃতি। 


এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো তোহা। মুচকি হাসি দিয়ে স্মৃতি গুলো কে উপেক্ষা করার চেষ্টা করল। 

কিন্তু চাইলেই কি সব উপেক্ষা করা যায়? কিছু কিছু অতীত না চাইতেও মনের কোণে উঁকি দিয়ে যায়। 


তোহা নিজের ঘরের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে লাগলো। 

তোহা নিজেকে প্রশ্ন করল, 

_আমি তো ভাবতে চাই না তাহলে কেনো অতীত গুলো আমার ভাবনায় চলে আসে? 

নিজের করা প্রশ্নে নিজেই হেসে ফেলল। 

এসব ভাবতে ভাবতে তোহা অতীতে ডুব দিল। 


"সময়টা ছিল প্রায় ৩ বছর আগের"


তোহা ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্রী। স্কুলের দশ বছরের স্মৃতি পেড়িয়ে কলেজে পা দিল। কিন্তু আগের সেই পুরনো বন্ধু, ক্লাসের আড্ডা, স্যার, মেডামদের কড়া বকুনির মাঝে লুকানো ভালোবাসা, বান্ধবীদের সাথে করা খুনসুটি কিছুই নেই। সব যেনো একটা অধ্যায় ছিল। যা খুব তাড়াতাড়ি জীবন থেকে চলে গেল। এসএসসি পরিক্ষার মধ্য দিয়ে দশ বছরের , বন্ধু-বান্ধবদের ইতি ঘটে। সবাই আলাদা হয়ে যায় শুধু থেকে যায় একসাথে কাটানো মধুময় অতীত। 


এসব ভেবে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর কলেজ যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। আজকে প্রথম ক্লাস কলেজে তাই তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে গেল। কলেজ কিছুটা দূরে তাই তোহা রিকশার জন্য দাঁড়ালো। কিছু সময় পর রিকশা‌ দেখে ডাক দিল তোহা এরপর রিকশায় উঠে বসল। রিকশা কিছুদূর যেতেই তোহার ফোনে কল আসল, তোহার বেস্ট ফ্রেন্ড নুসরাহ কল করেছে।


 _তোহা কল রিসিভ করে বলল, হ্যাঁ নুসরাহ বল।

_ওপাশ থেকে নুসরাহ বলল, তুই কোথায়? আসতে আর কতক্ষন লাগবে? 

_তোহা বলল, এইতো রিকশায় আছি" কিছুক্ষণ এর মধ্যে আসতেছি। 

_তোহার কথা শুনে নুসরাহ বলল, তাড়াতাড়ি আয়" আমি কলেজ এর সামনে আছি। 

_তোহা বলল, আচ্ছা” বলে কল কেটে দিলো। 


নুসরাহ হলো তোহার বেস্ট ফ্রেন্ড। স্কুল জীবন থেকেই ওরা ফ্রেন্ড। ভাগ্যক্রমে একই কলেজে দুইজন ভর্তি হয়ে গেল। তাদের বন্ধুত্ব এত মজবুত যে, দেখলে মনে হয়, দুইটা দেহ একটা প্রাণ। 


তোহা কলেজ এর সামনে নামলো, রিকশাওয়ালা কে ভাড়া মিটিয়ে সামনে আসতেই নুসরাহ কে দেখলো। নুসরাহ ও তোহাকে দেখে এগিয়ে আসলো। 


_তোহা বলল, চলে আসছি। এখন চল ক্লাসে যাই। 

_নুসরাহ বলল, হ্যাঁ চল" ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।


 তারপর দুজনে কলেজ এর ভিতরে ঢুকলো। প্রথম ক্লাস হওয়ায় অনেকে এসেছে। সব অপরিচিত মুখ। সিনিয়র, জুনিয়র এর মাঝে তোহা এবং নুসরাহ কাউকে চিনে না। 


নুসরাহ আর তোহার এত মানুষের মাঝে নিজেকে অসহায় লাগতেছে। 

_নুসরাহ বলল, বইন আমার নিজেরে এতিম লাগতেছে। 

_তোহা বলল, আমারও চল ক্লাসে যাই। 


দুইজন ক্লাসে চলে গেল, সেখানে অনেকে একসাথে আড্ডা দিচ্ছে, আর কেউ বসে আছে। তোহা আর নুসরাহ মাঝের সারিতে ফাঁকা জায়গা দেখে বসল, যেখানে আগে থেকে একটা মেয়ে বসা।


 _তোহা, নুসরাহ কে দেখে মেয়েটা বলল, 

"তোমাদের নাম কি? আমি কি তোমাদের সাথে পরিচিত হতে পারি? আসলে আমি কাউকে চিনি না। 

_নুসরাহ বলল, হ্যাঁ অবশ্যই। আমরাও কাউকে চিনি না। আমি নুসরাহ আর ও হলো তোহা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। 

_মেয়েটি বলল, আমার নাম মিমি। দূর ভাগ্য বসত আমার বেস্ট ফ্রেন্ড অন্য কলেজে ভর্তি হয়েছে। তোমাদের ভাগ্য অনেক ভালো। 

_তোহা বলল, মন খারাপ করিও না। আমরা আছি না। আজকে থেকে আমরা তোমার ফ্রেন্ড, বলে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। 


মিমি ও খুশি হয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। তারপর তিনজন ফ্রেন্ড হয়ে গেল।

তিনজন গল্প করতে লাগল। সাথে খুনসুটি। প্রথম ক্লাসে নতুন ফ্রেন্ড পেয়ে গেল তোহা আর নুসরাহ। 


এরপর থেকে তিনজন একসাথে আড্ডা, ঘোরাঘুরি করে। আর অনেক দুষ্টুমি ও করে। 


কিছুদিন পর তোহা কে‌ একটা ছেলে প্রপোজ করলো, ছেলে ওদের কলেজের সিনিয়র অনার্স এ পড়ে। দেখতে সুদর্শন। নাম আরহাম। 


তোহা রাজি ছিল না কিন্তু নুসরাহ আর মিমি জোর করল, রাজি হওয়ার জন্য। পরে কয়েকদিন ছেলেটার পাগলামি দেখে তোহা রাজি হল। শুরু হলো তোহা আর আরহাম এর প্রেম। 


এইভাবে এক বছর গেল তোহারা এইবার ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে। মিমির ফুফাতো ভাই এর সাথে বিয়ে ঠিক ছিল। এইচএসসি পরীক্ষার পর ওদের বিয়ে। আর নুসরাহ কারো সাথে প্রেম করে না। সবার প্রেম দেখে। তোহা আর আরহাম এর প্রেমকাহিনী আগের মতো নেই। আরহাম কেমন যেনো হয়ে গেল। আগের মতো কথা বলে না আর না পাগলামি করে। 

একদিন, আরহাম তোহাকে বলল, তোহা আমার পক্ষে এই সম্পর্কটা রাখা সম্ভব না। 


তোহার হৃদয় যেনো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। কেউ যেনো হাতুড়ি দিয়ে তার নরম হৃদয়টা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিল। চোখের পানি যেনো বাঁধ মানলো না। চোখ থেকে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ল।


_তোহা বলল, কেন? হঠাৎ কি হয়েছে তোমার। আমি কি কোনো ভুল করেছি? করলে বলো , আমি তোমার সব কথা শুনবো তাও ছেড়ে যেও। আমি কিভাবে থাকবো? বলেন না । আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে বিশ্বাস করেন। বলে তোহা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। 


 _আরহাম নিরবে চোখের জল ফেলল। কিন্তু তোহা কে বুঝতে দিল না। কন্ঠস্বর স্বাভাবিক করে বলল, ভালো থেকো। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আল্লাহ হাফেজ। বলে কল কেটে তোহা কে ব্লক করে দিল। তোহা কিছু বলতে গিয়েও পারলো না ততক্ষনে আরহাম তাকে ব্লক করে দিয়েছে। তোহা মোবাইল টা ছুড়ে মারল, যার ফলে ফোনটি ভেঙ্গে গেল। তোহা কান্নায় ভেঙে পড়ল। 


~আরহাম মোবাইলটা বেডে ছুড়ে ফেলে দিল। এরপর ভাবতে লাগলো, আরহাম এর কিছুদিন আগে থেকে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল কিন্তু সে তা পাত্তা দেইনি। কিন্তু দুইদিন আগে ব্যথা টা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় আরহাম ডাক্তার এর কাছে গিয়েছিল।ডাক্তার তাকে চেকআপ করতে বলে। চেকআপ করলে ডাক্তার রিপোর্ট দেখে বলল, তার হার্টে অনেক বড় প্রবলেম হয়েছে। যার জন্য তার ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হবে। অপারেশন হয়েও গেলে ঠিক হতেও অনেক সময় লাগবে। 

যেখানে নিজের জীবন রিস্ক এ আছে সেখানে তোহাকে নিজের জীবনে জড়াতে চায় না আরহাম। নিজের ভবিষ্যৎ কি হবে সেটা আরহাম নিজেও জানে না। নিজের পড়ালেখা ও শেষ হয়নি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতে তোহাকে রেখে কষ্ট দিতে চায় না আরহাম। তাই এই সিদ্ধান্ত নিতে হলো। 


~আরহাম আপনমনে বলল, আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও। তোমাকে যে অনেক ভালোবাসি আমি। তোমাকে চোখের সামনে কষ্টে দেখতে পারবো না আমি। সরি তোহা খুব সরি পারলে আমাকে মাফ করে দিও। 

আরহামের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। 


~"মানুষ বলে ছেলেরা বলে কান্না করে না, কিন্তু কথাটা যদি নিজের সখের নারীকে নিয়ে হয় তাহলে পুরুষ ও কাঁদতে বাধ্য।"


আরহাম চোখের পানি মুছে সুটকেস গুছিয়ে নিল। বিদেশে গিয়ে অপারেশন করাবে সাথে তার ফ্যামিলি ও যাবে আরহাম সুস্থ হলে দেশে আসবে। 


অন্যদিকে তোহা কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল।‌ 


কিছুদিন কেটে গেল। আরহাম তার ফ্যামিলি নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। আর তোহা মনমরা হয়ে থাকে বাসা থেকে বের হয় না ঘরের দরজা বন্ধ করে আরহাম এর ছবি দেখে কান্না করে। তোহার এমন আচরণ দেখে তোহার আম্মু নুসরাহকে ফোন করে। তোহার আব্বু, আম্মু ও অনেক টেনশন এ আছে। নিজেদের আদরের একমাত্র মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তারাও ভেঙ্গে পড়েছে। 


নুসরাহ তোহার আম্মুর কাছে সব শুনে তোহার বাসায় এসেছে মিমিকে নিয়ে। তোহার বাসায় এসে দুইজন তোহার রুমে গেল। দুবার দরজা নক করতেই তোহা দরজা খুলল। দরজার সামনে নুসরাহ ও মিমি কে দেখে বলল, তোরা আচ্ছা আয় ভিতরে আয় বলে তোহা রুমের ভিতরে চলে গেল। 


তোহার আচরণে নুসরাহ ও মিমি অবাক হলো। কারণ তোহা কখনো এইভাবে কথা বলে না। নুসরাহ হলে তোহার আর কিছু লাগে না সেখানে নুসরাহ কে দেখেও তোহার কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। তোহাকে দেখেও মনমরা মনে হলো। 


_নুসরাহ রুমে গিয়ে তোহাকে বিছানায় বসা দেখে বলল, তোহা কি হয়েছে তোর? তুই এমন মনমরা হয়ে আছিস কেন? আর তোর ফোন অফ কেনো? 

_তোহা নিরব হয়ে নুসরাহ এর দিকে তাকালো" তারপর বলল, কিছু হয়নি বলেই জোরপূর্বক হাসল। কথা ঘুরিয়ে বলল, অনেকদিন পর আসলি কি খাবি বল? আম্মুকে বলছি বানিয়ে আনবে। 


_নুসরাহ সন্দেহের দৃষ্টিতে তোহার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তোকে ভালো করে চিনি তোহা। কথা না ঘুরিয়ে সত্যি করে বল কি হয়েছে? আরহাম ভাইয়ার সাথে ঝগড়া হয়েছে নাকি? 

_আরহামের কথা বলাতে তোহার কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো। নুসরাহ কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। 

_নুসরাহ তোহার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, কান্না করিস না তোহা বলল কি হয়েছে? 

তোহা কান্না থামিয়ে সব বলল। 


নুসরাহ কি বলে সান্তনা দিবে বুঝতে পারছে না। কারণ সে নিজে আর মিমি তোহাকে জোর করেছিল। আরহাম ভাইয়া যে এমন করবে বুঝতে পারেনি। ভাইয়া তো তোহাকে অনেক ভালোবাসতো হঠাৎ কি হলো? 

নুসরাহ বলল, কান্না করিস সে হয়তো তোর ভাগ্যে ছিল না। সব বাদ দিয়ে নিজের লাইফে মুভ অন কর। 


মিমি এতক্ষন সব শুনে তোহার মন ভালো করার জন্য বলল, আমি এসেছিলাম আমার বিয়ের দাওয়াত দিতে কিন্তু তোরা যেভাবে কান্না করে ভূত হচ্ছিস মনে হয় না আমার বিয়েতে যাবি বলে। 


_নুসরাহ বলল, তোর বিয়ে কবে? 

_মিমি বলল, কিছুদিন পর তোদের দুইজনকে কিন্তু আসতে হবে নাহলে আমি বিয়ে করবো না। 

_মিমির কথা শুনে নুসরাহ বলল, তুই যদি বিয়ে না করিস তাহলে তোর জামাইটা আমাকে দিয়ে দিস। বলে হেসে ফেলল। 

_মিমি বলল, আমার জামাই তোরে দিবো কেন। 

_নুসরাহ হাসতে হাসতে বলল, তুই বিয়ে করবি না তাই। 

এদের দুইজনের কথা শুনে তোহাও হেসে ফেলল। 

এরপর তিন বান্ধবী একে অপরের সাথে খুনসুটি করতে লাগলো। 


কিছুদিন পর মিমির বিয়ে হয়ে গেল। তোহা আর নুসরাহ অনেক মজা করলো মিমির বিয়েতে। 


মিমি বিয়ে করে শশুরবাড়ি চলে গেল। তোহা ওর ফ্যামিলি নিয়ে চট্টগ্রাম চলে গেল। নুসরাহ ঢাকায় রয়ে গেল। 

____________


তোহা অতীতের চিন্তা থেকে বেড়িয়ে এলো। তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। আজ তিন বছর কেটে গেল। সেদিনের পর থেকে আরহামের সাথে আর কথা হয়নি। তার কোনো খোঁজ খবর ও জানা যায়নি। সে যেখানে থাকতো সেখানে কেউ থাকে না নুসরাহ খোঁজ নিয়ে জানিয়েছিল। নুসরাহ মাঝে মাঝে চট্টগ্রাম আসতো তোহার সাথে দেখা করতে” তাই তোহা তাকে রিসিভ করতে যাবে।মিমির সাথেও কথা হয় ও এখন ভালোই আছে।তোহা চোখের পানি মুছে রেডি হয়ে নুসরাহ কে রিসিভ করতে বেড়িয়ে গেল। সবকিছুর মাঝে একটা অপূর্ণতা রয়েই গেল। যা এখন ফেলে আসা স্মৃতি।


________~সমাপ্ত~________

গল্প ফেলে আসা স্মৃতি
Mukto Vabuk January 2, 2026
Share this post
Archive
Sign in to leave a comment