Skip to Content

ঝরা পাতার চিঠি

January 7, 2026 by
ঝরা পাতার চিঠি
Mukto Vabuk
| No comments yet

অনুগল্প : ঝড়া পাতার চিঠি 

#অক্ষরপ্রীতি_পরিবার × #Moktuvabuk


লেখক:সাঞ্জানা ইলমা


"আমি সুহাসিনী। নামটার মাঝে এক বুক হাসি লুকিয়ে থাকার কথা থাকলেও, বাস্তব বড় অদ্ভুত। যার জীবনে হাসির লেশমাত্র নেই, তার নামই রাখা হয়েছে সুহাসিনী! লিখতে গিয়েও আজ নিজের অজান্তেই একটা ম্লান হাসি ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছে। লোকে বলে, যার হাসি সুন্দর তাকেই সুহাসিনী বলা হয়। আমার হাসি কেমন? হয়তো সুন্দর ছিল কোনো এক কালে। 'হয়তো' বলছি কারণ, বহুকাল হলো নিজের হাসিমুখটা আয়নায় দেখার ফুরসত মেলেনি।


​আমার পরিবার কেন এই নাম রেখেছিল জানি না। তখন হয়তো তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, আমার জীবনের সবটুকু হাসি কেড়ে নেওয়ার পেছনে তারাই একদিন কারিগর হবে। আমার হাসার সবটুকু অধিকার কেড়ে নিয়ে তারা আজ আমায় নিঃস্ব করেছে। যাকগে, এসব লিখে সময় আর পাতা নষ্ট করে লাভ নেই। মন খারাপের মেঘ জমলে আমি নির্জনতা খুঁজি, নিজের সাথেই নিজে কথা বলি। আজকেও সেই উদ্দেশ্যেই আসা।


​বেঞ্চে বসে আনমনে আকাশ দেখছিলাম, ঠিক তখনই ওই বিশাল গাছটা থেকে একটা শুকনো পাতা টুপ করে ঝরে পড়ল। ঠিক যেন আমার জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। ভাবছেন পাতা আর জীবন—দুটো তো আলাদা? তবে একটা বড় পার্থক্য আছে। পাতাটা ঝরে গিয়ে অন্তত মুক্তি পেয়েছে। আর আমি? আমি তো সেই কবেই ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছি, কিন্তু আমার মুক্তি মেলেনি। আমি আজও ঝরে পড়তে পারছি না।


​পাতাটা উড়ে এসে ঠিক আমার পায়ের কাছে পড়ল। অসহায় পাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মায়া হলো। মা বলতেন, 'সুযোগ পেলেই মানুষকে সাহায্য করতে হয়'। আমি তো আর কোনো মানুষকে সাহায্য করার অবস্থায় নেই, তাই এই অসহায় পাতাটাকেই কুড়িয়ে নিলাম। পাতাটা হাতে নিতেই বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল— 'ইস! আমাকেও যদি কেউ একজন ঠিক এভাবেই আগলে নিতো, তবে হয়তো আমার জীবনটাও আর পাঁচটা মেয়ের মতো হতে পারত!'


​#ঝড়া_পাতার_চিঠি টা কে পাবে জানি না। তবে যে-ই পান না কেন, আমার জন্য একটু দোয়া করবেন। এই লেখাটা নিয়ে কৌতূহল দেখাবেন না, আমার ওসব সয় না। শুধু অনুরোধ—চিঠিটা ফেলে দেবেন না। খুব যত্ন করে রেখে দেবেন। আমার অন্তত এই সান্ত্বনাটুকু থাকবে যে, আমার মনের না বলা ভাষাগুলো কারো কাছে সযত্নে আছে। কেউ একজন আছে, যে আমার ফেলে যাওয়া স্মৃতিটুকু আগলে রেখেছে। এতে মরেও শান্তি পাব। আপনার জন্য শুভকামনা।


​ইতি,


#ঝড়া_পাতার_চিঠি'র মালিক"


​চিঠিটা পড়ার পর হৃদয় দীর্ঘক্ষণ পাথর হয়ে বসে রইল। ডিসেম্বরের কনকনে হাওয়ায় তার বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে উঠল। একটা মানুষের মনে কতটা বিষাদ জমলে সে নিজেকে ঝরে যাওয়া পাতার সাথে তুলনা করতে পারে?


​হৃদয় এই পার্কের পাশের কলেজেই পড়ে। পার্কের ঠিক উল্টো দিকেই তার হোস্টেল। বন্ধুরা সবাই শীতের ছুটিতে বাড়ি চলে গেছে। কিন্তু হৃদয়ের কোনো বাড়ি নেই; এতিমখানায় বড় হওয়া ছেলেটার হোস্টেলই এখন সব। মন ভালো করতেই সে পার্কে এসেছিল, কিন্তু বেঞ্চে পড়ে থাকা এই চিরকুট তার মনটাকে আরও ভারী করে দিল।


​মেয়েটা নিশ্চিত কোনো গভীর ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা সে কাউকে বলতে পারছে না। হৃদয় বারবার চিঠিটা পড়ল। সুহাসিনী—নামের অধিকারিণী মেয়েটি তার হাসির সৌন্দর্য জানে না, কিন্তু তার হৃদয়ের প্রতিটি শব্দ যেন এক একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে পড়ছে।


​হৃদয় পরম মমতায় চিঠিটা ভাঁজ করে রুমে নিয়ে এল। নিজের সবচেয়ে প্রিয় ডায়েরির ভাঁজে সে গুঁজে রাখল সেই নাম না জানা মেয়েটির হাহাকার। সে জানে না সুহাসিনী কে, কিংবা কোথায় তার বাস। সে শুধু জানে, কোনো এক অজানা প্রান্তে এক জোড়া বিষণ্ণ চোখ আজও কারো একটু 'কুড়িয়ে নেওয়ার' অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।


হৃদয় তার ডায়েরির পাতায় সুহাসিনীর সেই চিঠির পাশে নিজের মনের কথাগুলো লিখতে শুরু করল। সে জানে না এই লেখা কোনোদিন সুহাসিনীর হাতে পৌঁছাবে কি না, কিন্তু তার মনে হলো, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসেরই একটা উত্তর থাকা প্রয়োজন


​সুহাসিনী,


চিঠির শুরুতে প্রিয় সম্বোধন করতে পারলাম না।কিন্তু তুমি অপ্রিয় ও নও। ​তোমার চিঠিটা যখন পড়ছিলাম, তখন ডিসেম্বরের হাওয়াটা আমার কাছে আর শীতল মনে হয়নি; মনে হচ্ছিল ওটা তোমার বুকের ভেতরের কোনো এক গোপন হাহাকার। তুমি নিজেকে ঝরা পাতার সাথে তুলনা করেছ, আর আক্ষেপ করেছ যে তোমাকে আগলে নেওয়ার মতো কেউ নেই।


​জানো সুহাসিনী, আমরা যারা এতিমখানায় বড় হয়েছি, আমাদের কাছে 'আগলে রাখা' শব্দটা খুব বিলাসী। আমাদের জীবনে এমন কোনো পরিবার ছিল না যারা আমাদের হাসি কেড়ে নেবে, আবার এমন কেউও ছিল না যারা আমাদের হাসি ফিরিয়ে দেবে। আমরা মরুভূমির সেই বালির মতো, যাদের কেউ কেড়ে নিতে পারে না ঠিকই, কিন্তু কেউ পরম মমতায় মুঠোবন্দিও করে না।


​তুমি লিখেছ, পাতাটা ঝরে গিয়ে মুক্তি পেয়েছে কিন্তু তুমি পাচ্ছ না। অথচ দেখ, সেই মৃত পাতাটাকেও তুমি কুড়িয়ে নিয়েছ শুধু মায়ার টানে। তোমার ভেতরে যে অপরিসীম ভালোবাসা আর মমতা লুকিয়ে আছে, সেটা কি তুমি জানো? যে নিজের এত কষ্টের মাঝেও একটা শুকনো পাতার জন্য মায়া বোধ করে, তার চেয়ে সুন্দর হৃদয় আর কার হতে পারে!


​তোমার হাসি হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু তোমার শব্দগুলো আমার কাছে বেঁচে আছে। আমি কথা দিচ্ছি, তোমার এই 'না বলা ভাষা'গুলো আমি অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেব না। আমার এই নিভৃত ডায়েরির ভাঁজে তুমি আর নিছক কোনো চিরকুট নও, তুমি একজন বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।


​আমি জানি না তুমি এখন কোথায়, বা কোন জানলার পাশে বসে আকাশ দেখছ। শুধু এটুকু জেনে রেখো, এই বিশাল পৃথিবীতে সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষ তোমার সেই ফেলে আসা স্মৃতিটুকু খুব যত্ন করে আগলে রেখেছে। তুমি নিঃস্ব নও, অন্তত একজনের প্রার্থনায় এখন তোমার নাম মিশে আছে।


​ভালো থেকো সুহাসিনী। নিজের জন্য না হলেও, তোমার লেখাগুলো যে পরম মমতায় আগলে রেখেছে, তার সেই বিশ্বাসের অমর্যাদা করো না। কোনো একদিন হয়তো তোমার ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি নয়, সত্যিকারের সুহাসিনীর জয় হবে।


​ইতি,


সেই ছেলেটি, যে তোমার চিঠিটা কুড়িয়ে পেয়েছে।

ঝরা পাতার চিঠি
Mukto Vabuk January 7, 2026
Share this post
Archive
Sign in to leave a comment