#অক্ষরপ্রীতি_পরিবার × #Mukto_Vabuk
#অনুগল্প
#মৃত্যুর_শেষ_প্রহর
#লেখনীতে_আফরিন_সুলতানা
চারিদিকে ধূ ধূ কুয়াশা। চোঁখের সামনে এক বিশাল সমুদ্র ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না । এই সমুদ্রের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে শ্রেয়া । পরনে তার র/ক্ত মাখা লাল বেনারসি । তার হাঁটার তালে তালে দুহাত ভর্তি চুড়িতে ঝুন ঝুন শব্দ বাজছে । সমুদ্রের কিনারে এসে থেমে গেল সে । একবার পিছু ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে আবার সামনে তাকালো । হঠাৎ অতল সাগরে ঝাঁপ দিল শ্রেয়া। আরও অতলে তলিয়ে যেতে থাকলো সে । শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । বাঁচার প্রবল ইচ্ছা, কিন্তু শ্বাস নিতে ইচ্ছা করছে না । ক্রমশ নিথর হয়ে যাচ্ছে দেহটা।
হঠাৎ উঠে বসলো শ্রেয়া। দূরের মসজিদ থেকে ফজরের আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে । মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন ছুড়লো, " এমন স্বপ্ন কেন দেখলাম আমি ? "
ক্রমশ তার শ্বাস ঘন হয়ে আসছে । অন্ধকার ঘরে নিজেই নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে শ্রেয়া। আলো জ্বালিয়ে বাথরুমের দিকে গেল সে । চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে আয়নাতে তাকালো । সবকিছু আবার ধোঁয়াশা হয়ে উঠছে । আয়নাতে তার প্রতিবিম্ব তাকে প্রশ্ন করল, "কেন করলি এমনটা, কিভাবে করতে পারলি ?" শ্রেয়া একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল,"বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল যে,কি করতাম আমি ?"কথাটি শেষ করে সে ওযু করলো । ঘরে এসে ফজরের নামাজ আদায় করল ।সেই সাথে বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করলো ।
এখন ঘড়িতে আটটা বাজে ।শ্রেয়া রান্না ঘরে ঢুকে ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে চুলায় গরম করতে বসাল।হঠাৎ নিচে পরে থাকা ছুরিটার উপরে তার নজর পড়ল । ছুরিতে লাল রঙের দাগ লেগে আছে।শ্রেয়া সেটাকে উঠিয়ে এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। অন্যদিকে কেউ ক্রমাগত বেল বাজাচ্ছে । বেলের শব্দে সে বিরক্ত হয়ে হাতে থাকা ছুরিটা নিচে ফেলে দিল । কিন্তু ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। এবার রান্না ঘর থেকে সে টেলিফোনের আওয়াজ শুনতে পেল। কাছে গিয়ে টেলিফোন তুলে কানে ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো অভ্রর গলা। মুহূর্তেই শ্রেয়ার মুখে হাসি ফুটল।
" হ্যালো, অভ্র বলছি। "
" হুঁ , শুনছি , বলো। "
" শুনছো, কোথায় শুনছো?বেলের শব্দ শুনতে পাচ্ছো? টানা পনেরো মিনিট ধরে আমি দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছি। দরজা খুলছো না কেন?
"ওহ, তাহলে তুমি । আচ্ছা দাঁড়াও, আমি খুলছি দরজা।"
অভ্র "হুঁ" বলে কলটা কেটে দিল । আজ শ্রেয়া আর অভ্র বিয়ে করবে । অনেকদিন আগে থেকেই দিনটা ওরা ঠিক করে রেখেছিল। পুরোনো সব কথা ভাবতে ভাবতে হাসি মুখেই শ্রেয়া দরজা অবধি গেলো । কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা মনে করেই তার সব হাসি বিলীন হয়ে গেলো । সে আর দরজা খুলল না। শ্রেয়া ছুটে রান্না ঘরে এলো । মেঝেতে পড়ে থাকা ছুরিটা উঠিয়ে ভালোকরে পরিষ্কার করল। তারপর নিজের ওড়না দিয়ে তা মুছে চুলার কাছে গেলো । চুলায় বসানো দুধ পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছে। শ্রেয়া কোনরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুলা বন্ধ করে দিল । ছুরিটা হাতে নিয়েই সে তার রুমে গেলো । বিছানার উপরে ছুরিটা রেখে দিয়ে নিজেও বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল।
শ্রেয়ার ঘুম ভাঙ্গলো একবারে জুম্মার আযানের সময়। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। প্রচুর ক্ষুধা পেয়েছে , ঘুমও ভাঙতে চাইছে না। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,"আজ এত ঘুম পাচ্ছে কেন আমার ? ইস্ , বড্ড দেরি হয়ে গেল ! অভ্র আসবে তো। কি খাবে এসে? আমি বরং ওর পছন্দের খিচুড়ি বসিয়ে দেই । তারপর ও আসলে একসাথে খাবো।"
সন্ধ্যাবেলায় শ্রেয়া গোসল করে রুমে আসলো । অভ্র বিছানায় বসে গেইম খেলছে । শ্রেয়া আয়নার সামনে চুল মুছতে মুছতে বলল," ভিতরে কিভাবে আসলে ? কে খুলল দরজা ?"
অভ্র বাঁকা হাসি দিয়ে বলল," আমি তো এখানেই ছিলাম । আমায় বাইরেই বা যেতে দিলে কই ?সে সব বাদ দাও । এত শখ করে তোমার জন্য লাল বেনারসি টা আনলাম । পড়নি কেন ? আর হ্যাঁ,এই অবেলায় গোসল করার অভ্যাসটা বদলাও , শ্রেয়সিনী।"
শ্রেয়া মুচকি হাসি দিয়ে বলল ," তুমি বদলিয়েছিলে নিজেকে? আর লাল শাড়ি টা শেষ প্রহরে পড়বো ।
শ্রেয়া আয়নাতেই অভ্রর দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল । হঠাৎ দেখতে পেল অভ্র বিছানায় থাকা ছুরিটা দিয়ে নিজের পেটে ক্রমাগত আঘাত করছে । পুরো বিছানা র/ক্তে একাকার হয়ে গিয়েছে ।
ওখানেই শ্রেয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল ।
শ্রেয়ার জ্ঞান ফিরল শেষ প্রহরে । শরীরটা আর উঠতে চাইছে না । দেওয়াল ধরে কোনমতে উঠে দাড়ালো সে। তার কপাল কেটে গিয়ে র/ক্ত ওখানেই শুকিয়ে আছে । বিছানার এক কোনায় রাখা লাল শাড়ি টা নিয়ে কোনরকমে পড়ল সে । আলমারি থেকে খুব সাবধানে অভ্রর লা/শ বের করে বিছানায় রাখলো । শ্রেয়া তার র/ক্ত মাখা বুকে শুয়ে কাদতে কাদতে বলল,
" বিশ্বাস কর,আমি সত্যিই তোমায় মারতে চাইনি । আমি তো সব ছেড়েছুঁড়ে তোমার হাত ধরে এখানে এসেছিলাম । কিন্তু তুমি ? ওই ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠার কি খুব দরকার ছিল? হ্যাঁ, তুমি মত্ত হাতির মতো পাগল হয়ে উঠেছিল । তোমাকে থামানোর চেষ্টা করেছিলাম , কিন্তু এভাবে না । আজ তো আমাদের বিয়ে করার কথা ছিল । কিন্তু গতকাল ই তো সব শেষ হয়ে গেছে । জানো, আজ গোটা দিনটা আমি তোমায় হ্যালুসিনেট করেছি । একদিনেই আমার এই অবস্থা। সারাজীবন তোমায় ছাড়া কিভাবে থাকবো ?কেন করলে আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা? কিন্তু আমি তো আর তা করতে পারব না ।"
কথাগুলো বলে শ্রেয়া কান্না থামালো । টেলিফোনে নম্বর তুলে কল করে বলল,
"হ্যালো, এটা কি থানা? এখানে দুটো লা/শ পাওয়া গেছে । ছেলেটার নাম অভ্র আর মেয়েটার নাম শ্রেয়া। অভ্রকে অবশ্য শ্রেয়াই খু/ন করেছে । ঠিকানা বলার মত সময় আমার হাতে নেই ।প্রহর শেষ হতে চলল। আপনারা নম্বর টা ট্র্যাক করে চলে আসুন , প্লিজ।"
শ্রেয়া কথা শেষ করে টেলিফোনটা ওখানেই উল্টো করে রেখে অভ্রর কাছে এলো। তার বেনারসিটা অভ্রর র/ক্তে লাল হয়ে উঠেছে । সে বিছানার উপরে দাঁড়িয়ে শাড়ির লম্বা আঁচলটা খুব যত্নে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে বাঁধতে থাকলো ।