#শেষ_নিঃশ্বাসে_তুমি
..... জান্নাতুল_ফেরদৌস_মারিয়া
#অনুগল্প
❝কেমন আছো? আজকের দিনটা মনে আছে তোমার? আজকেই আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিলো।❞
এই বলে জারিফ চুপ হয়ে যায়। নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকায়ে থাকে কবরটির দিকে। জারিফ আবারও বলে উঠে,,,,,,,
❝দেখো আমি আমার কথা রেখেছি। বলেছিলাম না আমি আমার এই শেষ নিঃশ্বাস অব্দি তোমার পাশে থাকবো। যতো যাই হয়ে যাক আমি আমার এই মনে তুমি ছাড়া আর কাউকে জায়গা দিব না। দেখ দেই নি। আমার এই হৃদয়জুড়ে তুমি আছো।❞
জারিফ কাথাটা শেষ করেই পাশে রাখা কাঠ গোলাপ গুলো তোসিবার কবরের উপরে রাখে।
জারিফ আর তোসিবার পরিচয়টা ছিল খুব সাধারণভাবে। তাদের প্রথম দেখা হয় বাসে। জারিফের কাছে খুচরো টাকা না থাকায় তোসিবায় তা দিয়ে দে।
এরপর থেকেই ধীরে ধীরে কথোপকথন, তারপর বন্ধুত্ব, তারপর এমন এক সম্পর্ক—যেখানে প্রতিদিন কথা না হলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতো।
জারিফ ছিল শান্ত, দায়িত্বশীল, ভীষণ যত্নশীল একজন মানুষ। আর তোসিবা—হাসিখুশি, একটু জেদি, কিন্তু ভেতরে ভীষণ সংবেদনশীল। দু’জনেই দু’জনকে অসম্ভব ভালোবাসতো।
অবসর সময়ে ঘুরতে যাওয়া। এটা যেন তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। জারিফ তোসিবার ছোটো ছোটো সকল ইচ্ছাই পূরণ করে।
সময় গড়াতে গড়াতে সম্পর্কটা আরও গভীর হয়। জারিফ ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকে, তোসিবা যেন তা মন দিয়ে শোনে। বিয়ের কথা ওঠে, ছোট একটা সংসারের কল্পনা, জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখার গল্প—সবই ছিল তাদের আলোচনায়।
কিন্তু হঠাৎ করেই সব বদলে যায়।
প্রতিদিন সকালের মতোই জারিফ তোসিবাকে কল দেয়। কিন্তু না তোসিবা ফোন বন্ধ দেখায়। সে ভাবে ফোনের চার্জ নেই।
সে দুপুরে আবার মেসেজ, সন্ধ্যায় কল সব কিছুতেই ট্রাই করে। রাত পেরিয়ে যায়, তোসিবার কোনো সাড়া নেই। পরের দিনও একই। তারপর দিন, তারপর সপ্তাহ।
তোসিবা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
জারিফ পাগলের মতো তোসিবার খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করে। ফোন করে, মেসেজ পাঠায়, এমনকি তার পরিচিতদের কাছে খোঁজ নেয়। কিন্তু কোথাও কোনো উত্তর নেই। তোসিবার সব সোশ্যাল মিডিয়া নিষ্ক্রিয়। যেন সে ইচ্ছে করেই নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলেছে।
জারিফ ভেঙে পড়ে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে,,,,,,
❝আমি কি কোনো ভুল করেছি? আমি কি তোমায় কষ্ট দিয়েছি? প্লিজ তোসিবা ফিরে এসো। তুমি ছাড়া এই আমিটা যে নিঃস্ব।❞
জারিফ সেদিন পাগলের মতো কান্না করে। কিন্তুু কোনো লাভ হয়নি। তোসিবার কোনো খোঁজ সে পায়নি।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে যায়। তোসিবার স্মৃতিই হয়ে ওঠে জারিফের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। যে মেয়েটা একদিন তাকে ছাড়া ঘুমোতে পারত না, সে-ই আজ একেবারে নিশ্চুপ।
সময় কাউকে থামিয়ে রাখে না। দুই বছর কেটে যায়।
এই দুই বছরে জারিফ অনেক বদলে যায়। আগের মতো হাসে না, কারো সঙ্গে সহজে মিশে না। ভালোবাসার ওপর তার বিশ্বাসটা ভেঙে গেছে। তবুও, কোথাও একটা আশার আলো সে লুকিয়ে রাখে—হয়তো কোনোদিন তোসিবা ফিরবে।
ঠিক দুই বছর পর, জারিফ রাতে নিজের রুমে অফিসের কাজ করছিলো। হঠাৎ করে একটি মেসেজ আসে।
❝জারিফ…❞
একটা মাত্র শব্দ।
জারিফের হাত কেঁপে ওঠে। সে বিশ্বাস করতে পারে না। চোখে পানি চলে আসে। সে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দেয়—
❝তোসিবা? তুমি কোথায় ছিলে? জানো আমি কতটা কষ্ট পেয়েছি?❞
কিছুক্ষণ পর উত্তর আসে।
❝আমি জানি… আমি খুব অন্যায় করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি চাইলেই তখন কথা বলতে পারতাম না।❞
পরদিন তারা কথা বলে। অনেকদিন পর জারিফ তোসিবাকে দেখে। আগের মতো প্রাণবন্ত নয়, কণ্ঠে ক্লান্তি, দুর্বলতা।
কথার একপর্যায়ে তোসিবা কেঁদে ফেলে নলো,,,,
❝জারিফ, তুমি জানো আমি কেন হঠাৎ সব বন্ধ করে দিয়েছিলাম?❞
জারিফ চুপ করে থাকে। বুকের ভেতর অজানা ভয়।
তোসিবা ধীরে ধীরে বলে—
❝আমার ব্রেইন ক্যান্সার ধরা পড়েছিল।❞
জারিফ যেন মাটিতে বসে পড়ে বলে,,,,
❝কি বলছ তুমি?❞
❝হ্যাঁ। তখন ডাক্তাররা নিশ্চিত ছিল না আমি বাঁচব কিনা। মাথায় অপারেশন, কেমো—সব শুরু হয়েছিল। আমি নিজের শরীরই সামলাতে পারছিলাম না, তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।❞
জারিফ চোখের পানি আটকে রাখতে পারে না। সে কান্না করতে করতে বলে,,,,
❝তুমি আমাকে একবারও বলতে পারতে…❞
তোসিবা ফিসফিস করে বলে,,,,,,
❝আমি চাইনি তুমি আমাকে দুর্বল অবস্থায় দেখো। আমি চাইনি তুমি প্রতিদিন ভয় নিয়ে বাঁচো। তাই আমি নিজেকেই দূরে সরিয়ে নিয়েছিলাম।❞
নীরবতা নেমে আসে।
জারিফ বলে,,,,
❝তুমি জানো, ওই দুই বছরে আমি প্রতিদিন মরে গেছি? কিন্তু তবুও, তোমার জন্য আমার ভালোবাসা কমেনি।❞
তুসিবা হালকা হেসে বলে,,,,,
❝আমি এখন অনেকটা ভালো। পুরোপুরি সুস্থ নই, কিন্তু বেঁচে আছি। আর বেঁচে থাকতে চাই—তোমার সঙ্গে।❞
জারিফ দৃঢ় কণ্ঠে বলে,,,,
❝আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাইনি, তুসিবা। আর যাবও না।❞
বহুদিন পর, তারা আবার দেখা করে। তোসিবা আগের মতো নেই—চুল ছোট, শরীর দুর্বল। কিন্তু চোখে সেই একই ভালোবাসা।
জারিফ তার হাত ধরে বলে,,,,
❝তুমি যেমনই হও, তুমি আমার তোসিবা।❞
তোসিবার চোখ ভিজে যায়।
নীরবতার দুই বছরের অপূর্ণ ভালোবাসাকে তারা আবার খুঁজে পায়। এই ভালোবাসা আর শুধু কথার নয়—এখন এটা ত্যাগ, ধৈর্য আর বিশ্বাসের। এর কয়দিন পরেই তোসিবা চিরদিনের জন্য জারিফকে ছেড়ে চলে যায়।
কিছু কিছু ভালোবাসা শব্দে নয়, নীরবতায়ই সবচেয়ে গভীর হয়।
~সমাপ্ত~