অন্ধকারের_ছায়া
সুমাইয়া_তাছমিম
#অনুগল্প
সকাল থেকেই শোরগোল পরে যায় মরহুম দেলোয়ার সাহেবের স্ত্রী রোকসানা বেগমকে কেউ নির্মমভাবে হত্যা করেছে। কথাটা শোনামাত্র পুরো এলাকায় থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পুরো এলাকার মানুষ এসে ভিড় জমিয়েছে পুলিশ প্রেস সবাই উপস্থিত।
বাড়িতে রোকসানা বেগম আর ওনার পুত্রবধূ সাদিয়া বেগম থাকতেন। ওনার ছেলে বিদেশে থাকেন। রোকসানা বেগম নিচতলায় আর সাদিয়া বেগম দোতলায় থাকেন। দু'দিন আগে সাদিয়া বেগমের বোন ফাইজা বেড়াতে আসে।
পুলিশ পুরো বাড়ি দেখে আন্দাজ করেন রাতে হয়তো ডাকাত এসেছিলো আর তারাই রোকসানা বেগমকে হত্যা করে। সাদিয়া বেগম জানান সকাল ১০টা বেজে গেছে তখনও ওনার শাশুড়ি উঠছিলো না দেখে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো অসুস্থ। তাই আজকে উঠতে এতো দেরি করছেন। কিছুক্ষণ পর যখন তিনি শাশুড়িকে ডাকতে যান তখন দেখেন রোকসানা বেগম পুরো শরীর কাঁথা দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছেন। বেশ কয়েকবার ডাকার পরও যখন কোনো সাড়াশব্দ পেলেন না তখন ওনার শরীর থেকে কাঁথাটা সরাতেই তিনি আঁতকে উঠেন। ওনার চিৎকারে আসেপাশের মানুষ ছুটে আসে। এসে সবাই দেখতে পায় রোকসানা বেগমের ক্ষতবিক্ষত করা শরীর। যারা এই কাজ করেছে তারা কোনো কিছুতে কমতি রাখেনি।
সাদিয়া বেগম আরো জানান, তিনি এই বিষয়ে কিছুই জানেন না এমনকি তিনি কোনো কিছুর শব্দও পাননি। এতে পুলিশের সন্দেহ সাদিয়া বেগমের উপর পরে। রাতে বাড়ির একজনের এভাবে নির্মমভাবে হত্যা হয়েছে আর তিনি কিছুই জানেন না। এটা ঠিক পুলিশদের বোধগম্য হলো না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন,
“আপনার মতো একজন সুন্দরীকে রেখে ডাকাতদল হঠাৎ এই বয়স্ক মহিলাকে কেনো হত্যা করতে গেলো?”
এরপ্রতি উত্তরে সাদিয়া বেগম বিশেষ কিছুই বলতে পারেনি। পুলিশ আরো কিছুক্ষণ সাদিয়া বেগম ওনার বোন ফাইজা আর আশেপাশের মানুষকে কিছু জিজ্ঞেস করে চলে যান।
এই ঘটনার পর থেকে পুরো গ্রামের পুরুষরা নিজেদের এলাকাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সারারাত পাহারা দিতে থাকে। গ্রামে অপরিচিত কাউরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। সকলকে জানিয়ে দেওয়া হয় কেউ যাতে খুব প্রয়োজন ছাড়া সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের না হয়। এরপর থেকে সন্ধ্যা হলেই পুরো গ্রাম কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কোথাও কারো কোনো আনাগোনা নেই। পুরো গ্রামের মানুষের মনে একটা ভয় ঢুকে যায়।
গ্রামের যারা বখাটে গুন্ডা টাইপের তাদেরকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিন্তু বিশেষ কিছুই জানা যায়নি। এদের মধ্যে যাদের সাথে রোকসানা বেগমের ঝামেলা ছিলো তাদের সবাইকে নজরে রাখে পুলিশ।
এই ঘটনার প্রায় ২সপ্তাহ পরে সাদিয়া বেগমের বোন ফাইজাকে পুলিশ নিয়ে যায়। এতে সকলেই বেশ অবাক হয়। ফাইজা তো বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছিলো তাহলে তাকে কেনো নিয়ে যাচ্ছে। আর মেয়েটাতো যথেষ্ট ছোট তার উপরে এমনিতেও সন্দেহ যায় না তাহলে?
ফাইজা চেয়ারে বসে হালকা কাঁপছে তার সামনে ওসি রায়হান চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষণের নীরবতা পর রায়হান অত্যন্ত নরম কণ্ঠে বলে,
“কেনো করেছো এটা? তুমি একটা বাচ্চা মেয়ে বয়স কত হবে ১৫বা১৬। একা নিশ্চয়ই এটা করোনি তোমার সাথে কে ছিলো?”
ফাইজা আর না পেরে কান্না করে দেয়। রায়হান তাকে বাঁধা দিলো না। মেয়েটা যে প্রচন্ড ভয় পেয়ে আছে সেটা রায়হান বুঝতে পারে। দুই মিনিট পার হওয়ার পর রায়নার ফাইজার সামনে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে,
“পুরে ঘটনা খুলে বলো।”
ফাইজা কাঁপা কাঁপা হাতে পানির গ্লাসটা নিয়ে এক নিশ্বাসে পানি খেয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলতে শুরু করে,
ফাইজা প্রায় সময়ই বোনের বাসায় বেড়াতে আসতো। এখানেই এক ছেলের সাথে তার পরিচয় হয়। একে অপরের সাথে কথা বলতে বলতে দু'জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক হয়ে যায়। প্রায় সময় এখানে সেখানে দেখা সাক্ষাৎ করতো। তারপর ধীরে ধীরে এই প্রেম অনেকটা গভীরে চলে যায়। বিয়ের আগেই তাদের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক শুরু হয়ে যায়।
সেদিনও ফাইজা ছেলেটাকে ছাঁদ দিয়ে বাড়িতে ঢুকায়। রোকসানা বেগমের হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। তখন রাত ৩টা সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। রোকসানা বেগম পানি খাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হলে ফাইজার ঘর থেকে কোনো ছেলের কন্ঠস্বর শুনতে পান। কৌতূহল বসতো তিনি ফাইজার ঘরের দিকে যান। সেখানে ফাইজাকে একটা ছেলের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলে।
রোকসানা বেগমকে দেখে ফাইজা আর ছেলেটি ভয় পেয়ে যায়। রোকসানা বেগম তাদের দেখে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পরেন। সাদিয়াকে ডাকতে নিলে ফাইজা এসে তার মুখ চেপে ধরে। দুজনে মিলে ওনাকে ধরে রুমে নিয়ে যায়। প্রথমে ওড়না দিয়ে ওনার মুখ বেঁধে দেয়। নিজেদের সম্মানের কথা ভেবে এই দুটি অল্প বয়সের ছেলে মেয়ে একটি ভয়ংকর কাজ করে ফেলে। ফাইজা ছেলেটির কথায় রান্নাঘর থেকে বটি এনে ছেলেটির হাতে দেয়। দুজনেই রোকসানা বেগমকে চেপে ধরে রাখে। তিনি ছুটার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। ছেলেটি বটি দিয়ে ওনার গলা কেটে দেয়। কিছুক্ষণ রোকসানা বেগমে চাতক পাখির ন্যায় ছটফটিয়ে একদম শান্ত হয়ে যায়। রোকসানা বেগমের শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে ওনার পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। যাতে মানুষ দেখলে বুঝতে পারে রাতে ডাকাত এসেছিলো আর তারাই এমন করেছে।
তাদের কাজ শেষ হলে দুজনে নিস্তেজ শরীরটাকে ধরে বিছানায় সুয়ে দিয়ে পুরো শরীর কাঁথা দিয়ে মুড়িয়ে দেয়। তারপর নিচে পরে থাকা রক্ত মুছে ফেলে। সব কাজ শেষ হলে ফাইজা ছেলেটিকে আবার ছাঁদ দিয়ে পালাতে সাহায্য করে। আর ছাঁদের দরজা খুলা রাখে যাতে বুঝা যায় ডাকাত ছাঁদ দিয়ে বাড়িতে ঢুকে।
পুরো ঘটনা শুনে রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে আর কি কি না করে ফেললো। রায়হানের কথায় ফাইজা ছেলেটিকে ফোন করে একটা জায়গায় আসতে বলে। ছেলেটিও তার কথায় সেখানে চলে যায়। ছেলেটি আসতেই পুলিশের লোক তাকে ধরে আনে। পুলিক তাকে জেরা করলে সেও সব বলে স্বীকার করে নেয়।
গ্রামের মানুষ এই ঘটনা জানলে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। কি করে পারলো তারা একটা প্রাণ কেঁড়ে নিতে। নিজেদের অল্প বয়সের একটা ভুল কেঁড়ে নিলো একটা জলজ্যান্ত প্রাণ নষ্টও হলো তাদের জীবন।
(সমাপ্ত)