#অক্ষরপ্রীতি_অনুগল্প_প্রতিযোগিতা_১৬ডিসেম্বর
#অনুগল্প
সন্ধ্যাবতী
#মিহি_এহসান_পিয়ু
"এদিকে এসো। "
পরুষালি গম্ভীর কণ্ঠে কথাটা শুনেই হকচকিয়ে উঠলো নীলাঞ্জনা। একরাশ ভয়, ভীতি আর লজ্জা নিয়ে নীলাঞ্জনা সামনে দাঁড়ানো লোকটার দিকে তাকালো। মূহুর্তেই চোখাচোখি হলো সুদর্শন পুরুষটির সঙ্গে, যে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। নীলাঞ্জনা কে না আসতে দেখে তাশফিক সেহরাজ নিজেই এগিয়ে গেল। নীলাঞ্জনার মায়ামাখা মুখখানা একবার পরখ করে আবার সেই গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "হাত বাড়াও।"
গলার স্বরটা গম্ভীর হলেও কঠোর ছিল না, যেন সেখানে শুধু কোমলতাই মিশে আছে। নীলাঞ্জনা একরাশ অসস্তি নিয়ে কোনোমতে সামনে হাত বাড়ালো। তাশফিক তার হাতে একটা টাকার বান্ডিল আর একটা গয়নার বক্স দিয়ে দিল।
নীলাঞ্জনা প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকাতেই তাশফিকের কণ্ঠ ভেসে আসলো, "এটা দেনমোহরের টাকা। আর বক্সটাতে সামান্য একটা উপহার।"
নীলাঞ্জনা বক্সটা খুললো, সেখানে একটা ডায়মন্ড রিং ছিল। তাশফিক একটু গলা খাকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "পছন্দ হয়নি?"
নীলাঞ্জনা মাথা কাথ করে সম্মতি জানালো যে তার ভালো লেগেছে। তাশফিক মৃদু হাসলো, তারপর নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো, "পড়িয়ে দেই?"
নীলাঞ্জনা মুখে কিছু বললো না, বরং হাতটা সামনে এগিয়ে দিলো। তার এমন কান্ডে তাশফিকের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির ঝলক দেখা গেলো। সে অতি সন্তর্পনে নীলাঞ্জনাকে আংটিটা পড়িয়ে দিলো। শ্যাম বর্নের হাতে সাদা আংটিটা ঝকঝক করছে, দেখতেও বেশ লাগছে।
এরপর তাশফিক একটা ব্যাগ এগিয়ে দিলো নীলাঞ্জনার দিকে। নীলাঞ্জনা কিছু জিজ্ঞাসা করবে তার আগেই তাশফিক বললো, "এটা পরে এসো।"
নীলাঞ্জনা প্যাকেটটা খুলে দেখলো একটা বোরকা। সে অনেকটাই ইতস্ততা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "এতো রাতে বোরকা পরবো কেন? কোথাও যেতে হবে?"
"হুম।"
"কোথায়?"
"আমি যেখানে নিয়ে যাবো।"
প্রশ্নের আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে নীলাঞ্জনাও কথা বাড়ালো না।এমনিতেই তাশফিক তার কাছে অপরিচিত ।কিন্তু এখন এই অজানা লোকটাই তার স্বামী। এই লোকটার সাথেই তাকে এক ঘরে থাকতে হবে। ভাবলেই নীলাঞ্জনার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে।
---
স্তব্দ নিশীথে পাখিরা যখন ঘুমের দেশে পারি জমিয়েছে কোলাহল পূর্ণ ব্যাস্ত শহরটাও যেন ঘুমিয়ে আছে। টিরিং টিরিং শব্দ করা রিক্সাগুলো, পিপ পিপ হর্ন দেয়া গাড়িগুলো আর শাই করে উড়ে যাওয়া মটর সাইকেল গুলো একসাথে এসে ভীরছে না। ব্যাস্ত শহরটা যেন ক্লান্ত হয়ে ঘুমের দেশে পারি জমিয়েছে।
ল্যামপোস্টের আলোতে বেশ আকর্ষনীয় লাগছে শহরটা কে। রাতের শহর যে এতোটা সুন্দর সেটা নীলাঞ্জনা জানতোই না।
নীলাঞ্জনার মনে হচ্ছে রাতের আকাশের মুক্ত পাখি সে।সামনে বাইক চালানো লোকটা মুগ্ধ হয়ে তার সেই খুশি দেখছে আর ভাবছে " কি করে এতোটা মায়ায় পরে গেলাম এই শ্যামলিনীর।"
"এইতো গতকাল অব্দি আমরা একে অপরকে চিনতাম না।অথচ আজ সে আমার অর্ধাঙ্গিনী। "
"মেয়েটা কতটা সহজভাবে দুহাত মেলে বাতাসের সুঘ্রাণ নিচ্ছে।অথচ কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সে কতটা অস্বস্তিতে ছিলো।"
কিছুক্ষণ আগের ঘটনা :নীলাঞ্জনা একটা বড় গোমটা টেনে সেহরাজ মঞ্জিলের সবচেয়ে আলিশান রুমটাতে বসে ছিলো। একটা অজানা ঘরে বেশ ইতস্ততা হচ্ছিলো তার। দুঃখ, ভয়, অস্বস্তি সব যেন একসাথে আকড়ে ধরে আছে তাকে। ইচ্ছে করছে হাউমাউ করে কান্না করতে। কিন্তু এই অপরিচিত জায়গায় সেটা শোভা পায়না। কিছুক্ষন পর রুমে প্রবেশ করলো শেরোয়ানি পরিহিত এক সুদর্ষন পুরুষ। মুখে হালকা খোচা দাড়ি,গায়ের রং পরসা। পরিপাটি সাজ পোষাকে বেশ আকর্ষনীয় লাগছে তাকে।
পুরুষটি বিছানায় বসে থাকা শ্যামলিনীর দিকে একবার তাকালো তারপর ওয়াশরুমে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে বেশ ইতস্ততা নিয়েই নীলাঞ্জনা কে জিজ্ঞেস করলো "নামাজ পড়তে পারবে।"
নীলাঞ্জনা অস্বস্তির সাথেই হালকা ঘার কাত করলো। তারপর ওয়াশরুমে চলে গেলো। ওযু করে দুজনে নামাজ পড়লো। তাশফিক একবার নীলাঞ্জনার মায়ামাখা মুখ খানা পরখ করে মনে মনে আওড়ালো "মাশাল্লাহ। "
তারপর নীলাঞ্জনার অস্বস্তি দেখেই সে ঠিক করলো ওকে কিছুটা সময় দেয়া দরকার। ওর সাথে আস্তে আস্তে মিশতে হবে।তাই নিজেদের কে জানার জন্যই মূলত এই ব্যাবস্থা।
--
তাশফিক বাইকটা থামালো একটা সুন্দর পার্কের সামনে। নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে তাকালো তাশফিকের দিকে। তাশফিক হেসে বললো, "চলো, একটু হাঁটি।"
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়লো।তাশফিক আর নীলাঞ্জনা পাশাপাশি হাটতে লাগলো। আস্তে আস্তে তাদের দুজনের মধ্যে টুকটাক কথা বার্তা হলো। একে অপরের ভালো লাগা খারাপ লাগা ইত্যাদি। তাশফিক খেয়াল করলো নীলাঞ্জনা অনেকটাই সহজ আচরণ করছে। কিছুক্ষণ আগের সেই অস্বস্তি আর নেই।কথা বলতে বলতে কখন যে দুজন দুজনের হাত ধরে ফেললো খেয়াল ই করেনি । এরপর একে অপরের হাত ধরে খুনশুটি, গল্প আর মৃদু হাসির শব্দে তারা পার্কে প্রবেশ করলো। পার্কটা একদম ফাঁকা, শুধু তারা দুজন আর চাঁদের আলো। নীলাঞ্জনার মনে হলো যেন সে স্বপ্ন দেখছে।
তাশফিক হঠাৎ থেমে গেলো, আর নীলাঞ্জনার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। নীলাঞ্জনার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো, সে কিছু বলার আগেই তাশফিক বললো, "নীলাঞ্জনা,তোমার মুখে কি আছে। "
নীলাঞ্জনা মুখে, গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলো "কি?কিছু লেগেছে।"
"হুম।"
"কি লেগেছে?"
"মায়া"
কথাটা শোনা মাত্রই নীলাঞ্জনার শ্যাম বর্নের গালগুলো লাল হয়ে গেলো।
নীলাঞ্জনা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো, আর তাশফিক তার চিবুক ধরে আবার বললো, "মায়াবতী আপনি কি এই অধম কে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবেন। "
নীলাঞ্জনা মাথা নিচু রেখেই কিছুটা শব্দ করে হেসে উত্তর দিলো "গ্রহণ তো আপনার নামে কবুল পরেই করে নিছি। "
তাশফিক মৃদু হেসে নীলাঞ্জনার হাত ধরে যেতে যেতে বললো "চলুন মায়াবতী, এবার আপনার বাসায় যাওয়া যাক।"
নীলাঞ্জনার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
"আমার বাসায় মানে? আমরা আপনার বাসায় ফিরবো না। "
"এখন থেকে আমার বাসাই তো আপনার বাসা। আজ থেকে সেহরাজ মঞ্জিলের রানি আপনি। আপনার রাজপ্রাসাদে আমাকে একটু ঠাই দিয়েন।"
নীলাঞ্জনা তাশফিকের দিকে তাকিয়ে কান্নাভেজা চোখে হেসে ফেললো। তাশফিক নিজের দু হাত দিয়ে নীলাঞ্জনার চোখের পানি মুছে দিলো।
"আমার সন্ধ্যাবতীর চোখে পানি মানায় না।"
সেদিন তারা ঘুরেছিলো এই স্তব্দ শহরের আনাচে কানাচে। চিনেছিলো নিজেদের কে। একদিন আগে পর্যন্ত তারা অপরিচিত ছিলো কিন্তু আজ তারা একে অপরের পরিপুরক।
একদিনে ও যে কাউকে এতোটা আপন করা যায় সেটা তাশফিকের সাথে বিয়ে না হলে নীলাঞ্জনা বুঝতো না।এই মানুষটা একদিনেই তার হৃদয়ের প্রায় সবটুকু জায়গা দখল করে নিয়েছে। তার মতো শ্যাম মেয়ের কপালে এতো সুখ ছিলো??
এমন নয় যে এটা তার প্রথম ভালো লাগা। এর আগেও কেউ একজন এসেছিলো তার জন্য একরাশ পাগলামি করেছিলো। কিন্তু সে কখনোই কোনো অবৈধ সম্পর্ক চায়নি।তাই বারবার তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু ফেরানোর পরও সে বারবার ফিরে আসতো নীলাঞ্জনার জন্য মরে যাবে বলেছিলো।
নীলাঞ্জনার মতো শ্যাম বর্নের মেয়েকে কেউ ভালোবাসতে পারে সেটা সে ভাবেনি।তাই ওই ছেলের পাগলামি দেখে সেও একসময় মেনে নিয়েছিলো। প্রত্যেকটা মোনাজাতে সেই পুরুষকে চেয়েছিলো।
কিন্তু তার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায় নি নীলাঞ্জনা। শর্ত দিয়েছিলো কোনো অবৈধ সম্পর্কে যেতে পারবে না। কিন্তু নীলাঞ্জনার এই মেনে নেয়া ওই ছেলের জন্য মনে ক্ষুদ্র ভালোলাগার বিজ বপন করাই যেন তার কাল হলো। একটা সময় ছেলেটা হঠাৎ কোনো কারন ছাড়া তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো। আর তার চেহারা নিয়েও তাকে অনেক কথা শোনালো।
নীলাঞ্জনা সেদিন সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছিলো। অনেক অভিযোগ জানিয়েছিলো রবের দড়বারে।কিন্তু আজ সে বুঝতে পেরেছে ❝আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনা কারি।❞
তিনি তার জন্য এতো ভালো কিছু লিখে রেখেছিলেন বলেই হয়তো সেদিন তার দোয়া কবুল হয়নি।
তবুও তার মনের কোনে কোথাও একটা ভয় থেকেই যায়। যদি কখনো তাশফিক ও তার চেহারার জন্য তাকে ছেড়ে দেয়।
---------
সময় বহমান স্রোত। দেখতে দেখতে পাচটা বছর কেটে গেলো। তাশফিক সেহরাজ আর নীলাঞ্জনা সেহরাজের কোল আলো করে এই সেহরাজ মঞ্জিলের রাজকন্যা সুবহা সেহরাজ এসেছে।তার এখন প্রায় আড়াই বছর।
নীলাঞ্জনা সুবহাকে ঘুম পারাচ্ছিলো। তখনি পিছন থেকে তাশফিক এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
"সেহরাজ মঞ্জিলের রানি আর রাজকন্যা মিলে কি করছেন? "
"আপনি আমাদের রাজপ্রাসাদে ডুকেছেন কেন?"
"আমার সন্ধ্যাবতী কি রাগ করেছে? "
"ছাড়ুন আমাকে।"
"সরি সন্ধ্যাবতী।"
"সকালে না বলে কোথায় যাওয়া হয়েছিলো। "
"Happy anniversary সন্ধ্যাবতী। "
নীলাঞ্জনা হকচকিয়ে উঠলো।
"তার মানে আপনার মনে ছিলো। "
"এই বিশেষ দিনটা ভুলি কি করে?"
নীলাঞ্জনা লজ্জায় মাথা নিচু করে মৃদু হাসলো।
"এখনো লজ্জা পাচ্ছো। আচ্ছা সন্ধ্যাবতী তোমার মনে আছে পাচ বছর আগে আজকের দিনটার কথা। "
"আচ্ছা আপনি আমাকে সবসময় সন্ধ্যাবতী ডাকেন কেন। আর কখনো আপনি কখনো তুমি এভাবেই বা ডাকেন কেন? "
"প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন?"
"বলুন না প্লিজ।"
"দিনের শেষে সন্ধ্যা নামার পর চাদ যেভাবে আলো ছড়ায় তুমিও সেভাবেই আমার জীবনে অন্ধকারের মাঝে আলো জ্বালিয়েছো তাই তুমি আমার সন্ধ্যাবতী। আমার মায়াবতী। "
এরপর তাশফিক সুবহা আর নীলাঞ্জনার কপালে আদর একে দিয়ে রুম ত্যাগ করতে করতে বলে গেলো "রেডি হয়ে নেও আজ মেয়েকে নিয়ে পাচবছর আগে ঘুরে আসবো।
আজকে ও তারা ঘুরলো ঠিক সেই রাতের মতোই তবে তাদের পূর্নতার সাক্ষী হিসেবে আজ তাদের সাথে সুবহা সেহরাজ রয়েছে।
নীলাঞ্জনার মনে এখন আর কোনো সংশয় নেই। সে জানে এই পুরুষ টি একান্তই তার ব্যাক্তিগত। যে তাকে কখনো ছাড়বে না।
ঘোরা শেষে ঝলমলে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাশফিক নীলাঞ্জনার কাদে হাত রেখে বলে উঠলো
❝আমার মনেরো ঘরে
তুমি এসেছিলে বলে
দেখেছিলাম সুখ স্বজনী
রজনী ভোরে❞
নীলাঞ্জনা ও তার কথার প্রতিউত্তরে বললো
❝আমার হাসিরো ঢোলের
তুমি হয়েছিলে কারণ
তোমার সাথে বেধেছি তাই
এই আমার জীবন ❞
~সমাপ্ত।