#অক্ষরপ্রীতি_অণুগল্প_প্রতিযোগিতা_১৬ই_ডিসেম্বর
গল্প : ভাড়াটে বাবা
লেখক: নীলাভ দাস
শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নর্দমার ঠিক পাশেই 'কালীপুর বস্তি'। এই বস্তিটা যেন মূল শহরের এক পরিত্যক্ত ক্ষত। এখানে সূর্যের আলো পৌঁছানোর আগেই অভাবের অন্ধকার হানা দেয়। টিনের চালার ওপর বৃষ্টির শব্দ এখানে কোনো রোমান্টিকতা আনে না, বরং আনে ঘর ভেসে যাওয়ার আতঙ্ক। এই জরাজীর্ণ বস্তির শেষ মাথায় একটা ছোট খুপরি ঘরে বাস করেন অমরেশ বাবু। বয়স আশির কোঠায়। ধবধবে সাদা চুল-দাড়ি আর তিলককাটা কপাল। সবাই তাকে ‘দাদাভাই’ বলে ডাকে।
অমরেশ বাবুর বিশেষত্ব হলো তিনি চোখে দেখেন না। মোটা একফালি সাদা কাপড় সবসময় তার চোখের ওপর বাঁধা থাকে। প্রতিদিন ভোরে রিকশাচালক রহমত তার ঘরে আসে। রহমতের বউটা কলেরায় মারা যাওয়ার পর থেকে পাঁচ বছরের ছেলে আবিরই তার একমাত্র সম্বল। রহমত যখন রিকশা নিয়ে বেরোয়, তখন আবিরকে রেখে যায় অমরেশ বাবুর কাছে।
অমরেশ বাবু আবিরের হাত ধরে লাঠিতে ভর দিয়ে মোড়ের মাথায় বড় অশ্বত্থ গাছটার নিচে গিয়ে বসেন। তার সামনে একটা প্লাস্টিকের বাটি। পথচারীরা কেউ দু-পাঁচ টাকা ফেলে যায়। আবির পাশে বসে ছোট ছোট পাথরের টুকরো নিয়ে খেলে। অমরেশ বাবু তার অদৃশ্য চোখ দিয়ে যেন সব অনুভব করেন। তিনি আবিরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, "এই দুনিয়াটা খুব নোংরা রে বাপ। তুই কি শুনতে পাস? এই শহরের চাকাগুলো আমাদের মতো মানুষকে পিষে দিয়ে চলে যায়।"
আবির অবুঝের মতো চেয়ে থাকে। সে চেনে শুধু তার দাদাভাইয়ের ঝোলার ভেতর থাকা দু-একটা বিস্কুট আর পরম মমতা। বস্তির প্রতিটি মানুষ অমরেশ বাবুকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এমনকি স্থানীয় থানার কনস্টেবল জগদীশ বাবুও মাঝে মাঝে ডিউটি শেষে অমরেশ বাবুর পাশে বসে চা খান। তিনি বলেন, "দাদাভাই, আপনি মানুষ নন, আপনি দেবতা। এই নরকে থেকেও আপনি কেমন শান্ত হয়ে থাকেন!"
শান্তিটা বেশিদিন টিকল না। বস্তিতে এক অশুভ ছায়া ঘনিয়ে এল। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাশের ব্লকের হারানের ছেলে আর কাঞ্চন দাসের ছোট মেয়েটা উধাও হয়ে গেল। চারদিকে হইচই পড়ে গেল। পুলিশ এলো, তল্লাশি চলল, কিন্তু ওইটুকু বস্তির কোথায় যে বাচ্চাগুলো মিলিয়ে গেল, কেউ জানে না। মানুষের মনে আতঙ্ক—ছেলেধরা ঢুকেছে।
রহমত কাজ থেকে ফিরে আবিরকে বুকে জাপ্টে ধরে কাঁদে। অমরেশ বাবু তার কাঁপা কাঁপা হাত রহমতের পিঠে রেখে সান্ত্বনা দেন, "কাঁদিস না রহমত। এই পাপের শহরে ওরা থাকলে হয়তো বড় হয়ে পাপীই হতো। ঈশ্বর হয়তো ওদের আরও ভালো কোনো জায়গায় নিয়ে গেছেন।"
রহমত ফুঁপিয়ে ওঠে, "দাদাভাই, অভাবের সংসার আমার, কিন্তু আবির ছাড়া আমার কেউ নাই। ওরে আপনি দেইখেন।"
অমরেশ বাবু ম্লান হাসেন। সেই হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে ছিল, তা বোঝার ক্ষমতা কারোর ছিল না। "আমি তো পাহারা দিচ্ছি রে রহমত। আমি তো সব দেখছি,"—তার এই কথাটার নিহিত অর্থ কেউ ধরতে পারেনি।
ঘটনার চরম মুহূর্তটা এলো এক অমাবস্যার রাতে। সেদিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছিল। রাস্তার মোড়ে রহমতের রিকশার চাকাটা গর্তে পড়ে ভেঙে গেল। বাধ্য হয়ে অনেক আগেই তাকে ঘরে ফিরতে হলো। সারা শরীর ভেজা, মনে অস্থিরতা। বস্তির সরু গলিতে পা দিতেই রহমতের মনে হলো চারপাশটা আজ বেশি নিস্তব্ধ।
অমরেশ বাবুর ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় রহমত দেখল ঘরের দরজায় ছোট একটা ফাঁক। ভেতর থেকে একটা হলুদ আলোর আভা আসছে। রহমত জানত দাদাভাই অন্ধকারে থাকতে ভালোবাসেন, কারণ আলোর তো তার কাছে কোনো মূল্য নেই। কৌতূহলবশত সে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল।
পর মুহূর্তেই রহমতের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
ঘরের ভেতরে অমরেশ বাবু দাঁড়িয়ে আছেন। কুঁজো হয়ে থাকা সেই মানুষটা আজ একদম টানটান সোজা। সবথেকে ভয়ের বিষয়—তার চোখের সেই সাদা পট্টিটা মেঝেতে পড়ে আছে। যে মানুষটাকে সবাই অন্ধ জানত, তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে কোনো করুণা নেই, আছে এক অমানবিক শীতলতা।
রহমত দেখল, ঘরের মেঝেটা আগে থেকেই খোঁড়া। অমরেশ বাবু খুব যত্ন করে একটা ছোট গর্তের ভেতর আবিরের সেই প্রিয় লাল গেঞ্জি আর একটা খেলনা গাড়ি চাপা দিচ্ছেন। রহমত চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। সে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
"দাদাভাই! আমার আবির কই? আপনি... আপনি তো চোখে দেখেন!" রহমত আতঙ্কে তোতলাতে লাগল।
অমরেশ বাবু ধীরস্থিরভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। তিনি বললেন, "অন্ধ আমি নই রহমত, অন্ধ তোরা। তোরা এই নরকটাকে দেখতে পাস না। আমি তো আবিরকে ভালো রাখতে চেয়েছি।"
"কোথায় আমার ছেলে?" রহমত তার কলার চেপে ধরল।
অমরেশ বাবু মাটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, "ও এই মাটির নিচে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। তুই কি চাস ও বড় হয়ে তোর মতো রিকশা টানুক? লোকে ওকে ‘কুত্তার বাচ্চা’ বলে ডাকুক? আমি ওকে মুক্তি দিয়েছি রহমত। দারিদ্র্য একটা রোগ, আর আমি সেই রোগের নিরাময় করছি। আমি ওদের মেরে ফেলিনি, আমি ওদের এই কুৎসিত পৃথিবীর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছি।"
রহমত স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত দুটো শিথিল হয়ে এল। অমরেশ বাবু বলে চললেন, "তোর ঘরে কালকের চাল নেই। তোর ছেলেটার গায়ে তালি দেওয়া জামা। বড় হয়ে ও হয় চোর হতো, না হয় ভিখারি। আমি ওকে পবিত্র থাকতেই ঈশ্বরের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি কোনো পাচারকারী নই রহমত, আমি এক ‘ভাড়াটে বাবা’। তোদের মতো হাজারো অক্ষম বাবার হয়ে আমি তাদের সন্তানদের মুক্তি দেই।"
বাইরে তখন পুলিশের সাইরেন বাজছে। বস্তির মানুষ ভিড় করছে। রহমত অমরেশ বাবুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার মগজে যেন বজ্রপাত হচ্ছে। সে একদিকে দেখছে তার মৃত সন্তানের স্মৃতি, আর অন্যদিকে দেখছে তার সামনের ধূসর ভবিষ্যৎ।
রহমতের হঠাৎ মনে হলো, অমরেশ বাবু যা বলছেন তা কি ঠিক? এই পৃথিবীতে কি দারিদ্র্যের চেয়ে বড় কোনো পাপ আছে? সে কি পারবে আবিরকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে?
পুলিশ যখন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল, তারা দেখল—অমরেশ বাবু আগের মতোই সেই সাদা পট্টি চোখে বেঁধে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছেন। আর রহমত তার পায়ের কাছে মাথা ঠুকছে।
জগদীশ বাবু জিজ্ঞেস করলেন, "রহমত! আবির কোথায়? আমরা খবর পেয়েছি কিছু কাপড় পাওয়া গেছে এখানে।"
রহমত মুখ তুলল। তার চোখে কোনো জল নেই, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে অমরেশ বাবুর দিকে একবার তাকাল, তারপর পুলিশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "স্যার, আবিরকে কেউ নিয়ে যায় নাই। ও ভালো আছে। দাদাভাই ওরে শান্তি দিছে। আমি আর আমার ছেলে—আমরা দুজনেই এই অন্ধকার থাইকা মুক্তি চাইছি।"
পুলিশ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রিকশাচালক রহমত আর ‘অন্ধ’ অমরেশ বাবু—দুজনে মিলে যেন এক নতুন পৃথিবীর বিচার শুরু করেছে, যেখানে দারিদ্র্যের সমাধান হলো নীরব প্রস্থান।
বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ল। সেই রাতে কালীপুর বস্তির আকাশ থেকে যেন কান্না নয়, বরং এক আদিম উপহাস ঝরে পড়ছিল।
......….................... সমাপ্ত .........................