লেখনীতেঃযারিন_তাসনিম
#অক্ষরপ্রীতি_পরিবার × #MuktoVabuk
#অসমাপ্ত_প্রেমের_উপাখ্যান
#অনুগল্প
বরিশালের সেই পুরনো মহল্লাটিকে মনে পড়লেই এক ধূসর আলো ভেসে ওঠে মনে। ভোরের শিশিরভেজা বাতাস, কাঁচা রাস্তার ধুলো আর কলাপাতায় জমে থাকা জলবিন্দু যেন সাক্ষী ছিলো এক অসমাপ্ত প্রেমের। সেই মহল্লার দুই বাড়ি পাশাপাশি,একটিতে রেহান, আরেকটিতে আয়রা। শৈশব থেকেই একে অপরের ছায়ার মতো তারা বড় হয়েছিল।
শৈশব থেকেই তারা একে অপরের ছায়া। বিকেলবেলা খেলতে নেমে যাওয়া, গলিতে ক্রিকেট, লুকোচুরি কিংবা আম কুড়োনো,সব জায়গায় তাদের হাসির শব্দ গমগম করতো।
আয়রা ছিল প্রাণচঞ্চল, দুষ্টুমি আর খুনসুটিতে ভরপুর। আর রেহান ছিল শান্ত, লাজুক, কিন্তু চোখে স্বপ্নমাখা এক জেদ। সে অকারণেই আয়রার হাসি দেখেই মুগ্ধ হয়ে যেতো, আর সেই হাসি দিনের পর দিন তার মনে অজানা আলো জ্বালিয়ে রাখতো।
এক বিকেলে, বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে যাওয়া গলিতে হঠাৎ ছাতা ভাগাভাগি করে ফিরছিল তারা দুজন। আয়রা হেসে বললো
“তোকে ছাড়া আমি স্কুলে যেতেই চাই না। জানিস, ক্লাসে তুই না থাকলে কতটা ফাঁকা লাগে?”
রেহানের বুকের ভেতর কেমন জানি ধক করে উঠলো। সে কিছু বললো না, শুধু মাথা নেড়ে দিলো। তার খাতার পাতায় সেই রাতেই লেখা হলো, “আয়রা, আমি তোকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না।”
কিন্তু সেই কথা খাতাতেই রয়ে গেলো, ঠোঁটে এলোনা।
সময় বয়ে যায়। বয়স যখন কৈশোর থেকে তরুণে পা রাখলো, তখন সেই বন্ধুত্বের ভেতর থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠলো অন্যরকম এক অনুভূতি। চোখে চোখে কথা বলা, চুপচাপ একে অপরকে খুঁজে ফেরা,সবকিছুই যেন ভালোবাসার অদ্ভুত ইঙ্গিত। কিন্তু সাহস হলো না উচ্চারণ করার।
একদিন বিকেলে, পুকুরপাড়ে বসে আয়রা হঠাৎ বললো,
“রেহান, তুই যদি একদিন দূরে চলে যাস, আমি কীভাবে থাকবো?”
রেহান মৃদু হাসলো। উত্তর দিলো,
“আমি দূরে যাবো কেন? তুই যদি আমার সাথে থাকিস, তবে আমি সবসময় তোর কাছেই থাকবো।”
কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হলো না।
রেহানকে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় যেতে হলো। বিদায়ের দিনটায় আকাশ মেঘে ঢাকা। আয়রা চুপ করে দাঁড়িয়ে, চোখ ভিজে আছে, ঠোঁটে কোনো শব্দ নেই। শেষ মুহূর্তে সে হাত বাড়িয়ে দিলো। রেহানও তার হাত ধরলো। সেই ছোঁয়াতেই যেনো হাজারটা না-বলা কথা জমে রইলো।
ঢাকায় নতুন পরিবেশ, পড়াশোনার চাপ,সব মিলিয়ে জীবন কঠিন ছিলো। তবুও প্রতিদিন রাতে ফোনের ওপাশে থাকতো আয়রার কণ্ঠ।
“আজ তোর ক্লাস কেমন হলো?ঠিকমতো খেয়েছিস তো?”
এমন সাধারণ প্রশ্নও রেহানের জীবনে অমূল্য হয়ে উঠেছিলো।
কিন্তু ভাগ্যের খেলা বড় নিষ্ঠুর।
অনার্স শেষ করে যখন রেহান বরিশালে ফিরলো, তখন বুকভরা আশা ছিলো,এবার আর দেরি নয়, আয়রাকে বলেই দেবে, সে-ই তার জীবনের সবকিছু।
কিন্তু ফিরে এসে শুনলো এক মর্মান্তিক খবর। আয়রার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। পাত্র ধনী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর ছেলে।
রেহান বিশ্বাসই করতে পারছিলো না। সেই রাতে, চাঁদের আলোয় উঠোনে দাঁড়িয়ে সে আয়রাকে জিজ্ঞেস করলো,
“তুই কিছু বললি না কেন আয়রা? আমি তোকে ছাড়া কিছু ভাবিনি কখনো।”
আয়রার চোখ ভিজে উঠলো। সে বললো
“আমি কী বলতাম রেহান? আমার বাবা-মা যা ঠিক করেছে, তাই-ই আমার ভাগ্য। আমি তো মেয়ে… আমার কথা কারো কানে পৌঁছায় না।”
রেহানের বুক ভেঙে চুরমার হলো। সে আয়রার চোখে ভালোবাসা দেখলো, কিন্তু সেই ভালোবাসা সমাজের কঠিন দেওয়ালে আটকে রইলো।
।
।
বিয়ের দিন লাল শাড়িতে সেজে ওঠা আয়রাকে দেখার জন্য রেহান দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। বুকের ভেতর যেনো আগুন জ্বলছিলো। ভিড়ের আড়াল থেকে তাকিয়েই সে ভেঙে গেলো।
সেদিন থেকেই তার পতনের শুরু।
রেহান মদের নেশায় ডুবে যেতে লাগলো। প্রতিটি রাত গ্লাসে গ্লাসে গিলে ফেলতো নিজের যন্ত্রণা। বন্ধুদের বোঝানো, পরিবারের কান্না,কিছুই তাকে ফেরাতে পারলো না। তার ঠোঁট প্রতিদিন একটাই নাম উচ্চারণ করতো “আয়রা…”
দিন থেকে বছর গড়িয়ে গেলো। আয়রা সংসারের খাঁচায় বন্দি হলো। বাহ্যিকভাবে সে সংসার চালালো, সন্তান বড় করলো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিটি মুহূর্তে সে রেহানকে খুঁজে ফিরলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলে মনে হতো,এই মুখের আড়ালে এক মৃত হৃদয় লুকিয়ে আছে।
রেহানের অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগলো। শরীর ভেঙে যাচ্ছিলো, মুখে কালো ছাপ, চোখে অবসাদ। তবুও সে আয়রাকে ভুললো না।
অবশেষে এক ঝড়ো রাতে, বৃষ্টির ভেতরে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লো রেহান। খবর পেয়ে সবকিছু উপেক্ষা করে ছুটে এলো আয়রা। ভিজে চুল, কাঁপতে থাকা ঠোঁট নিয়ে তার পাশে বসে কাঁদছিলো।
রেহান ক্ষীণ হাতে আয়রার হাত চেপে ধরলো। ফিসফিস করে বললো,
“আয়রা, আমার শেষ ঠিকানা তুই-ই, আমি তোকে ছাড়া কখনো বাঁচতে শিখিনি।”
আয়রার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিলো। সে কিছু বলতে পারলো না, শুধু হাতটা শক্ত করে ধরে রইলো।
কিন্তু সময় থেমে থাকেনি। রেহান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো। ঠোঁটে শেষ শব্দ,“আয়রা…”
আয়রার বুক ফেটে চিৎকার বের হলো। কিন্তু সেই চিৎকার সমাজের নিয়ম ভেদ করতে পারলো না।
।
।
এরপর পৃথিবী আবার নিজের নিয়মে চলতে লাগলো। আয়রা সংসার সামলালো, সন্তানের মা হলো, কিন্তু অন্তরের গভীরে প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করলো,রেহানই ছিলো তার সত্যিকারের ভালোবাসা।
আর রেহান? সে চলে গেলো, কিন্তু তার নাম হয়ে রইলো অমর,আয়রার হৃদয়ে, অসমাপ্ত এক প্রেমের উপাখ্যান হয়ে।
ভালোবাসা কখনো মরে না। মরে শুধু মানুষ। ভালোবাসা থেকে যায়..অপূর্ণ, অসমাপ্ত, তবুও অনন্ত।
❝সমাপ্ত❞
#অসমাপ্ত_প্রেমের_উপাখ্যান
#লেখনীতেঃযারিন_তাসনিম
#অনুগল্প