#অক্ষরপ্রীতি_পরিবার_অনুগল্প_প্রতিযোগিতা
অনুগল্প: #নিঃসঙ্গ_পরবাস
কলমে: #সাদিয়া_তিন্তি
ভোরের প্রথম প্রহরে ঘরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে এক অমিমাংসিত মোহনীয় গন্ধ। এটা ঠিক চন্দনের মতো নয়, কিংবা বৃষ্টিতে ভেজা মাটির মতোও না। এই গন্ধটা অদ্রিতের ভাষায় এক নারীত্বের গন্ধ। যেন কোন এক পুরনো দিনের শাড়ির আঁচল থেকে আসা ধূপ-লাগানো স্নিগ্ধতা। অদ্রিত চোখ বন্ধ করেই অনুভব করে যাচ্ছে সবটা। মাঝে মাঝে তার কানে ভেসে আসছে কাচের চুড়ির খুব ক্ষীন শব্দ। সে প্রথমে কল্পনা ভেবে প্রতিক্রিয়া না দেখালেও এখন এক রকম জোর জবরদস্তি করেই ঘুম ভাঙা চোখ দুটো খুললো। তার দৃশ্যপটে প্রথম যে দৃশ্য ভেসে এলো তাঁতে তার চোখ চড়কগাছ। এক ঝটকায় উঠে বসলো সে।
তার নিজের ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। পরনে খুব সুক্ষ্ম সুতোর কাজের সাদা শাড়ি, কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ আর সেই টিপের আশেপাশে ঝুলছে কিছু অবাধ্য চুল, চোখে এমন এক দৃষ্টি, যা একাধারে স্নিগ্ধ, আবার গভীর। মেয়েটি অদ্রিতের বুকশেলফ থেকে একটার পর একটা বই টেনে বের করছে, পাতাগুলো উল্টাচ্ছে, সাথে টুকটাক গুনগুন করছে এমন স্বচ্ছন্দতায়, যেন ঘরটা তার চিরপরিচিত।
প্রথম কয়েক মুহূর্ত অদ্রিত এই দৃশ্যের কোন বর্ণনা খুঁজে পেল না। সে যেন কল্পনা, স্বপ্ন আর বাস্তবকে কোনভাবেই এক করতে পারছে। আরো কিছু সময় পর যখন সে বুঝতে পারে নারী মূর্তিটি তার কল্পনা কিংবা স্বপ্ন নয়, তার বাস্তবে দাঁড়িয়ে আছে তখন সে অধিক উত্তেজনায় বিছানা থেকে চিৎকার করে বলল, “কে তুমি? আমার ঘরে কি করছো তুমি? মা কি চলে এসেছে?”
মেয়েটা একটুও চমকালো না, বরং চুপটি করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল একই নজরে তাকিয়ে। অদ্রিত মেয়েটার দিকে আর গুরুত্ব না দিয়ে এক ঝটকায় নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সারা বাড়িতে নিজের মা’কে খুঁজতে শুরু করল। বার কয়েক মাকে আওয়াজ দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে বুঝলো তার মা এখনো বাড়ি ফেরেনি। অদ্রিতের বাবা-মা দিন দুয়েক হল অদ্রিতের বড় মামার ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে গিয়েছেন। এত মানুষ, এত কোলাহল এই দায় দিয়ে অদ্রিত কোনভাবে নিজের মা বাবার পিছু ছাড়িয়েছে। সে নিজে একাই থাকবে বাড়িতে। অদ্রিতের পছন্দ না একাধিক মানুষ, এবং সকলের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যাওয়া। ব্যক্তিগতভাবে সে একাকীত্ব গ্রহণ করা এক ব্যক্তি। যেখানে এই কোলাহল কিংবা নতুন পরিচয়ের মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে সে সর্বদা নিজেকেই বেছে নেয় একা একা থাকার জন্য। এবং গত দিন দুয়েক সে একাই ছিল। হুট করে এই অপরিচিতা নারীর দেখা পাওয়া মাত্র তার ভাবনায় এসেছিল, নারীটি বোধহয় তার মায়ের সঙ্গে তাদের বাড়িতে এসেছে। কিন্তু সারা ঘরে তার মা’কে খোঁজার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে অদ্রিত নিজের ঘরে ফিরে যায়। গিয়ে দেখতে পায় সেই অপরিচিতা নারীটি সেই একই ভঙ্গিতে তার ঘরে বইয়ের আলমারির সাথে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। অদ্রিত গিয়েই মেয়েটিকে প্রশ্ন করে, “তুমি আমার বাড়িতে ঢুকলে কি করে? কে তুমি? চোর…? ডাকাত….? ছদ্মবেশি?”
মেয়েটা অদ্রিতের এমন প্রশ্নে যেন খুব মজা পেল, সে নিজের মৃদু হাসি থামিয়ে বলল, “তুমি কখনো দেখেছো এত সুন্দরী চোর বা ডাকাত?"
অদ্রিত বেশ বিরক্ত হয়ে বলল, “ভালোয় ভালোয় নিজের পরিচয় দাও, না হলে কিন্তু আমি এখনই পুলিশে ফোন দেবো।”
মেয়েটা সেই একই রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “অদ্রিত তুমি পুলিশের ভয় দেখাচ্ছ কেন আমাকে? আমি কি তোমার বাড়িতে চুরি করতে এসেছি?”
অদ্রিত নিজের নাম মেয়েটার মুখে শুনে এক পা পিছিয়ে গেল। এরপর স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করল, "তুমি আমাকে কীভাবে চেনো?"
মেয়েটা খুব অনায়াসে বলল, “তোমাকে না চেনার কি কিছু আছে? নিজের ঘরে নিজের নাম যদি কেউ এরকম বড় বড় অক্ষরে লিখে রাখে তবে তো যে কোন অন্ধও বলতে পারবে এ ঘরের মালিকের নাম অদ্রিত। তাছাড়া তোমার আলমারির সবগুলো বইয়ের ভেতরেও তোমার নাম সুন্দর করে লেখা। তুমি তো নিজের পরিচয় দিতে কোত্থাও কৃপণতা করোনি।”
অদ্রিত মেয়েটার কথায় সামান্য ধাতস্থ হয়। যেহেতু মেয়েটার হাতে এখনো অদ্রিতের নিজেরই একটা পছন্দের বই রয়েছে এবং সেখানেও অদ্রিত নিজের নামের ছাপ রাখতে ভোলেনি। এই হিসেব মতে তার নাম জানা অনায়াসে সহজ। অদ্রিত এবার নিজের টেবিলের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে। মেয়েটা তার সামনে ঠায় দাঁড়ানো। অদ্রিত এবার খুব তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এ বাড়িতে প্রবেশ করেছো কি করে? আমি মাত্র দেখে এলাম বাড়ির মেইনগেট বন্ধ। আর আমার বাড়িতে এমন কোন শর্টকাট উপায় নেই যাতে তুমি আমার ঘর অব্দি আসতে পারবে!”
মেয়েটা এবার যেন বলতে চায় তার প্রবেশের কারণ। অদ্রিতের বিছানার একটা কোনায় বসে তার হাতের বইটাকে শক্ত করে ধরে ধীর গলায় বলল, “আমি মেইন গেট দিয়ে এসেছি। সত্যি বলতে, আমি নিজের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি। আমার খুব আশ্রয়ের দরকার ছিল। আমি ভেবেছিলাম আপনার এই বাড়িতে হয়তোবা কেউ নেই। নিচে দারোয়ানের কাছে বলতে শুনেছিলাম ফ্লাট নম্বর ২-বি তে বাড়ির মালিক বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছেন। তাই হয়তো ফ্লাট সমিতির মিটিংএ অ্যাটেন্ড করতে পারবেনা। এই কথা শুনে, আমিও চুপিসারে এই ফ্লাটের দরজার কাছেই আসি, দরজাটা লক ছিল। কিন্তু আগে থেকেই লক দরজা খোলার একটা ছোটখাটো অভ্যাস আছে আমার। আমি চুলের ক্লিপ দিয়ে একটু চেষ্টা করতেই খুলে যায়। প্রথমে ভেবেছিলাম ফ্লাটে হয়তো কেউ নেই, পরে আপনার ঘরটায় যখন এসে দেখি আপনি ঘুমোচ্ছেন। তখনই চলে যেতে চেয়েছিলাম। তবে, আপনার ঘরের বইয়ের আলমারিটা দেখে বইগুলোর প্রতি আর লোভ সামলাতে পারিনি। অবশ্য আমার যাবার জায়গাও নেই।”
অদ্রিত ঘটনাটা ঠিক বিশ্বাস করেও করতে পারছে না, সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি বাড়ি থেকে পালিয়েছো কেন?”
অপরিচিত মেয়েটা খুব অনায়াসে ঠান্ডা স্বরে বলল, “আমার বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন এক বৃদ্ধ লোকের সঙ্গে। আমি শুধু মুক্তি চাইছিলাম, তাই পালিয়ে এসেছি। আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। আপনি কি মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য আমাকে আশ্রয় দিতে পারেন?”
অদ্রিত কিছু একটা ভাবলো কিন্তু ওর ভাবনা বাস্তবে ঠিক মিলছে না। একটা অপরিচিতা মেয়েকে ও এই বাড়িতে থাকার অনুমতি কি করে দিতে পারে! তাও আবার তার নিজের বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে!
তবুও সে কিছু একটা ভাবে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কি?”
অপরিচিত মেয়েটি খুব মিষ্টি করে বলল, “মৃণালিনী।”
অদ্রিত এবার একটু থমকালো। গত দিন দুয়েক ধরে সে যেই বইটা পড়ছে সে বইয়ের প্রধান নারী চরিত্রটার নামও মৃণালিনী। এমনকি সেও তার বিয়ে থেকে পালিয়ে শহরে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেয়। এসব কি মাত্রই কাকতালীয়? অদ্রিতের গা ঘামতে শুরু করল। সে জানে, এটা অসম্ভব। কোন চরিত্রের বই থেকে বাস্তবে বেরিয়ে আসা অসম্ভব। তবে এমনটাও হতে পারে, মেয়েটাও এই একই বইটা পড়েছে এবং তার মন গড়া কাহিনী বানাচ্ছে। অদ্রিত তাও একবার মেয়েটার হাতের বইটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “তুমি কি… বই থেকে বেরিয়ে এসেছো?”
মৃণালিনী হেসে বলল, “ধুর! কেউ কি বই থেকে বের হতে পারে, অদ্রিত?”
অদ্রিত ক্ষিপ্রতা নিয়ে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে তুমি এই বইয়ের একই ঘটনা আমাকে কেন শোনাচ্ছো?”
মৃণালিনী আবারো হেসে বলল, “অদ্রিত সাহেব, বই পড়তে পড়তে আপনার মাথায় বই পোকা হয়েছে। আপনি ভুলে যাচ্ছেন বইগুলো বাস্তব থেকেই লেখা হয়, আবার কখনো কখনো বাস্তব বইয়ের মত হয়। এখন সবকিছুই কি মিথ্যে?”
অদ্রিত আর কথা বাড়ায় না। আসলেই তো এসব অবাস্তব প্রশ্ন। সে যেন এবার বিশ্বাস করতে চাইছে এই অপরিচিতা মৃণালিনীকে। সে এই নারী মূর্তিকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। মেয়েটি একেবারেই উপন্যাসের কোন নায়িকাদের আদলে গড়া। পুরনো শাড়ির মায়ায় কি যত্নে মোড়ানো। লম্বা চুলের বেনুনিটা বেশ মানিয়েছে তাকে। এ যুগে এমন বেনুনী ক’জন করে? এ যুগে এতো লম্বা চুল-ই বা ক’জনের আছে! সে তো তার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন মেয়ের এত লম্বা চুল দেখেনি!
অদ্রিত একা থাকতে ভালোবাসে না, একাকিত্বকে ভালোবাসে বলাটাও ভুল হবে। বরং সে এই একাকিত্বকে আপন করে নিয়েছে। অদ্রিতের ভাষায়, “মানুষজনের ভিড় মানেই নৈঃশব্দ শূন্যতা। আর আধুনিকতার বেওয়ারিশ সঙ্গ থেকে একাকিত্ব ঢের ভালো।”
অদ্রিত কারো সাথে খুব একটা কথা বলে না, প্রয়োজন ছাড়া মুখ খোলে না বললেই চলে। বাইরের পৃথিবী, তার নিয়ম, তার খেলা, তার মুখোশ সবকিছুর সঙ্গে একটা দূরত্ব বজায় রাখে অদ্রিত। তার মনে হয়, এই সমাজে সে ঠিক মানিয়ে নিতে পারে না। কিংবা সমাজই হয়তো অদ্রিতকে বুঝতে চায় না। কেউ তার মতো না। অদ্রিতের ভাবনা অনুসারে, মানুষের আবেগ, সম্পর্ক, হাসি-কান্না সবটাই যেন একটা নিছক অভিনয়। তাই কারো সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার সাহস সে করে না। নিজের ভেতরের পৃথিবীটাই তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে সত্য।
অদ্রিত তার ভাবনা গুলোকে ছুটি দেয়। সে যেন তার একাকীত্ব জীবনে এক ফোঁটা বসন্ত পেয়ে বসেছে। একটা দুটো করে প্রহর কাটে, তাদের কথা বাড়ে। তারা একসাথে বই পড়ে, বারান্দায় বসে, সন্ধ্যায় চা খায়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার তারা একইরকম। দুজনের পছন্দ অপছন্দ, কথা বলার ভঙ্গি, এমনকি স্বপ্নও এক। যেন মৃণালিনী অদ্রিতের মনের গভীর থেকে জন্ম নেয়া সেই আকাঙ্ক্ষিত নারী। অদ্রিত জীবনে প্রথমবার যেন সুখ শব্দের সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পায়। তার ভালো লাগতে শুরু করে মৃণালিনীর চঞ্চলতা, তার বোকামি, বাচ্চামু এমনকি সঙ্গ দেওয়া। অদ্রিত মৃণালিনীর জন্য তাদের গেস্ট রুমটা খুলে দেয়। অন্ততঃ যে ক'দিন বাবা মা বাড়িতে না ফিরছে সে ক'দিন স্বাধীন। তারা ফিরে এলেই অন্য ব্যবস্থা করতে হবে মৃণালীনির জন্য। অদ্রিত চায় না মৃণালীনি তার নিজের বাড়িতে আর কোনদিনও ফিরে যাক।
সময়ের সাথে অদ্রিতের সমাজের থেকে বিচ্ছিন্নতা আরও গভীরভাবে তীক্ষ্ণ হয়। এভাবেই কাটতে থাকে দিন। উপন্যাসে আজকাল অদ্রিত অনুভব পায়। সে শুধু মৃণালিনীর সাথে কথা বলতেই ভালোবাসে। মৃণালিনী প্রায় হুট করেই তার হাত পা ভত্তি আলতায় রাঙিয়ে নেয়। অদ্রিতের কাছে এই রঙ তীক্ষ্ণ প্রেমিক হৃদয়ে উস্কানিমূলক লাগে। সে মৃণালিনীকে পরিষ্কার জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি বরাবরই সেকেলে ধরনের? না মানে, তোমার কাছে একটা শতাব্দী পুরানো গন্ধ আছে।”
মৃণালিনী হাসে, সে তার চুলের গুচ্ছ হালকা সরিয়ে বলল, “তোমার আমাকে আদৌতেও মানুষ মনে হয় তো? কখনো তুমি আমাকে চোর ভাবো, কখনো ডাকাত, আবার কখনো বই থেকে বেরিয়ে আসা ভূত। আর এখন তোমার নাকে যাচ্ছে শতাব্দী পুরনো গন্ধ।”
অদ্রিত হেসে ফেলে এমন উপহাসে, তারপর বলল, “তুমি জানলে অবাক হবে সে এই বইটা আমি এখনো শেষ করতে পারিনি। প্রতিদিন পড়ার চেষ্টা করি কিন্তু পৃষ্ঠা যেন আগাচ্ছে না।”
মৃণালিনী বেশ নাটকীয়ভাবে বলল, “কি করে আগাবে? বইয়ের প্রধান চরিত্র বইয়ের বাইরে হাওয়া খেতে বেরিয়ে গেছে।”
অদ্রিত শুধুই হাসে। কিছু সময় পরে সে আকাশের দিকে তাকে বলল, “জীবনটা যদি গল্পের মতো হতো কত্তো ভালো হতো। ডানা ছাড়াই উড়তাম অনেক অনেক দূর। গল্প হতো না মন খারাপের।”
মৃণালিনী অদ্রিতের হাতের বইটা বন্ধ করে বলল, “অদ্রিত জানো তো, এই শতাব্দীর একাংশ দখল করে আছে চরমপন্থী বিষাদ। এগুলোই এখন সার্বজনীন, সহজলোভ্য, স্থায়ী। বলতে পারো, দুঃখ আমাদের এত চরমভাবে ভোগায়, তবুও তার এমন অস্বাভাবিক জনপ্রিয়তা কেন? দুঃখই কেন তবে পৌশাচিক চাহিদা?”
অদ্রিত অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মৃণালিনীর দিকে। এরপর খুব ধীরে বলল, “তাহলে কি আমরা সবাই দুঃখ পেতে চাই? তাই এতো আয়োজন? নাকি দুঃখ আমাদের রক্তকনিকার অন্ত্রে অন্ত্রে মিশে গেছে যাকে আলাদা করা যায় না?”
মৃণালিনী বলল, “হয়তো এখন মানুষের কাছে সুখ থেকে বিষাদ অধিক গ্রহণযোগ্য। যেমন তোমার প্রিয় একাকিত্ব।”
অদ্রিত চুপ করে যায়। মৃণালিনী বরাবরই একটা মায়া। তার এমন গভীর শব্দচয়নে এখন আর অবাক হয় না অদ্রিত। সন্ধ্যা পেরোয়। অদ্রিত এখন নিয়ম মাফিক মৃণালিনীর জন্য চা করে। মৃণালিনী বড্ডো অপারগ, সে তো ঠিকঠাক পছন্দের গানটাও আধুনিক মিউজিক সিস্টেমে বাজাতে জানে না। সব কিছু বারবার অদ্রিত শেখায় যত্ন নিয়ে।
সময় একটু এগিয়ে দিন পাঁচেক পর অদ্রিতের বাবা-মা তার মামার বাড়ি থেকে ফেরত আসে। অদ্রিত আর উপায়ন্তর না পেয়ে সিদ্ধান্ত নেয় মৃণালিনীকে নিজের ঘরেই যে ক’দিন লুকিয়ে রাখা যায় আর কি। সে সিদ্ধান্ত নেয় খুব দ্রুতই মৃণালিনীর জন্য একটা সুরক্ষিত বাসস্থান খুঁজে দেবে। ততদিন মেয়েটা ওর সঙ্গেই থাক।
দিনের আলো গলে যায় নরম ছায়ায়, আর ছায়া গিয়ে মিশে যায় দু’জন মানুষের কথোপকথনে। অদ্রিত আর মৃণালিনী যেন এক অলিখিত ছায়ার সংসার গড়ে তোলে। জীবনে প্রথমবার অদ্রিত বুঝতে পারে, ভালো লাগা আসলে ঠিক কোনো যুক্তির বিষয় নয়, ওটা একটা অনুভব। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে যেন, কোন ভাবেই তার বাবা মায়ের নজরে মৃণালিনী না ধরা পড়ে যায়। অদ্রিত বার বার লুকায়। মৃণালিনীও লুকাতে একেবারেই ওস্তাদ।
অদ্রিত বুঝে নিচ্ছে মৃণালিনীকে। মৃণালিনীর ও তার মতোই– মানুষ, ভিড়, আলো এসব পছন্দ নয়। অদ্রিত শুধু মৃণালিনীর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটা কীভাবে এতটা চেনা হয়ে উঠল এই এত অল্প সময়ে?
কয়েকটা দিন, নাকি কয়েকটা জীবন, এইভাবে কেটে যায়? তার হিসেব মেলে না অদ্রিতের।
অদ্রিতের বাবা মা বেশ কয়েকদিন খেয়াল করেছে অদ্রিত যেন কার সাথে কথা বলে। তবে ফোনে কথা বলছে ভেবে এড়িয়ে যায়। তাদের একা থাকার পোকা ছেলে যে সঙ্গ পেয়েছে এটা ভেবেই যেন সুখ তাদের। তবে এই সুখে বেগড়া বাঁধে তখন, যখন অদ্রিতের বাবা অদ্রিতকে বারান্দায় বসে হেসে হেসে কথা বলতে দেখে নিজের সাথেই। প্রথমে ব্যাপারটা এত গভীরভাবে না নিলেও পরপর কয়েকদিন খেয়াল করে একই দৃশ্য দেখতে পায়। অদ্রিতের বাবা এই প্রসঙ্গে অদ্রিতের সঙ্গে কথা বলতে গেলে, এগুলো তার বাবার ভুল ধারণা বলে অদ্রিত একেবারে অস্বীকার করে দেয়। অদ্রিতের বাবাও কথা বাড়ায় না আর। তবে আবারো একদিন দুপুরে, দরজার ফাঁক দিয়ে অদ্রিতের বাবা খেয়াল করেন, অদ্রিত একা বসে আছে, কিন্তু কথোপকথন চলছে দু’জনের মধ্যে। মানে ঠিক এমন ভাবে কথা বলছে যেন তার সামনে কেউ একজন বসে আছে এবং তার প্রশ্নের উত্তর করছে অদ্রিত। তখন আর চুপ থাকতে পারেন না তিনি। ঘরে ঢুকে রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কার সঙ্গে কথা বলছো?”
অদ্রিত চমকে তাকায়, “কোথায়! আমি? না তো।”
অদ্রিতের বাবা ব্যাপারটাকে গুরুতর হিসেবে নিয়ে এবার আর কথা বাড়ান না। সোজা তার স্ত্রীকে সব বলেন। অদ্রিতের মা একেবারে ভেঙে পড়েন। ছেলের জন্য ভয় পেয়ে যান। ওই দিনের মধ্যেই অদ্রিতের মা যোগাযোগ করেন এক পরিচিত হুজুরের সঙ্গে। যিনি ঝাড়ফুঁক করেন, তাবিজ দেন, পানি পড়া দেন।
অদ্রিত প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে মজা পেতে শুরু করে। সে ভাবে, ওর বাবা-মা ঘরের বাইরে থেকে ওদের আলাপ শুনে মনে করেছে জীন পরিতে ধরেছে। সে হেসে ফেলে। হুজুরের আসার কথা শুনে অদ্রিত মৃণালিনীকে ছাদে রেখে আসে। হুজুর সময় মতো আসে, কোরআনের আয়াত পড়েন, তেল ছিটান, খাটের তলায় তাকিয়ে বলেন, “এই মেয়েটা মানুষ না। এই মেয়েটা পরী। আরে ভাই, ওরে জীন ধরছে।"
অদ্রিত যেন পুরো বিষয়টাতেই একটা রহস্যের আনন্দ খুঁজে পায়। এটা তার কাছে একধরনের অদ্ভুত অ্যাডভেঞ্চার। যেখানে সে একা, আর মৃণালিনী তার গোপন সঙ্গী। এক হুজুর যায়, আরেকজন আসে। পানি পড়া, তাবিজ, কালোজিরা, ধূপ, কোরআনের আয়াত সব চেষ্টা যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে গিয়ে থামে। মৃণালিনী ঠিক যেমন ছিল, তেমনই রয়ে যায়।
এই খবরটা একদিন পৌঁছে যায় অদ্রিতের চাচাতো ভাই সৌরভের কানে। সদ্য এমবিবিএস শেষ করা তরুণ ডাক্তার, এখন এক প্রাইভেট হাসপাতালে কর্মরত। সৌরভের সঙ্গে অদ্রিতের সম্পর্কটা বরাবরই অন্যরকম। একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠা, ছেলেবেলার হাসি-ঠাট্টা এখনো সম্পর্কটাকে জিইয়ে রেখেছে। বাড়িতে এসে সৌরভ চাচা চাচির থেকে সবটা শুনে অদ্রিতের রুমে ঢোকে। ধীরে, সাবধানে, যেন একজন চিকিৎসক নয়, একজন ভাই। সৌরভ অদ্রিতের চোখের দিকে তাকিয়ে তাকে পড়ার চেষ্টা করে। তবে এক চঞ্চলতা দৃশ্যমান হয় অদ্রিতের মাঝে। সৌরভের মাঝে বিশ্বস্ততা পেয়ে, অদ্রিত সব কিছু বলে ফেলে। মৃণালিনীর কথা, ওর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি দিনের কথা, এমনকি তার উপস্থিতি। সৌরভ চুপ করে শোনে। এরপর একেবারে আবদার করেই বলল, “আমাকে মৃণালিনীর সঙ্গে একটু দেখা করাবি? আমিও দেখতে চাই মেয়েটা আসলেও তোর বর্ণনা করা উপন্যাসের নায়িকার মত সুন্দর কিনা।”
তখনই যেন অদ্ভুত কিছু ঘটে যায়। মৃণালিনী হঠাৎ একদম নিখোঁজ। অদ্রিতের ভাষ্যে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রেখেছে সে। তাকে ডাকলেও দরজা খোলে না। তবে তার কথা শুধু অদ্রিত শুনতে পায়। অদ্রিত উদ্বিগ্নভাবে দরজায় কড়া নাড়ে, ডাকে, অনুরোধ করে, কিন্তু কোনও সাড়া নেই। সৌরভ দেখতে পায়, দরজা আটকানো নয় বরং জ্যামের কারণে শক্ত হয়ে আছে। অদ্রিত একটু অন্যদিকে সরলেই সৌরভ জোরে দরজা খুলে দেখে ভেতরে কেউ নেই। অদ্রিতের মনে যেন কোন সন্দেহ না জাগে তাই আর সে এদিকে বেশি কথা বাড়ায় না। সৌরভ বাহানা করে সোজা বসার ঘরে চলে যায়। চাচা-চাচিকে ডেকে শান্ত গলায় বলল,“চাচা, আমি অর্থোপেডিক্স এ আছি। ওর যা অবস্থা, ওকে একবার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান।”
কথাটা অদ্রিতের বাবা একেবারেই গ্রহণ করতে পারেন না। তিনি চিৎকার করে ওঠেন, “তুই কি বলছিস, সৌরভ? আমার ছেলে পাগল নাকি?"
অদ্রিতের মা আঁচলে মুখ ঢেকে কান্না চেপে রাখতে চেষ্টা করেন। সৌরভ ধীরে গলার স্বর নিচু করে। সে জানে, এদের বোঝাতে হলে তর্ক নয়, দরকার নরম অথচ তীক্ষ্ণ ভাষা। সৌরভ বলল, “চাচা... মনের রোগও শরীরের মতোই রোগ। জ্বর হলে যেমন চিকিৎসা দরকার, মাথা বা মনে সমস্যা হলে তারও দরকার চিকিৎসা। বিষয়টা যতটা কঠিন ভাবছেন, ততটা নয়। বরং চিকিৎসা না করলে এটাও মারাত্মক হবে।”
তবে অদ্রিতের বাবা মা সৌরভের কথা মানতে নারাজ। সৌরভ দীর্ঘ সময় বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে নিজের বাড়িতে ফেরে। কিন্তু এরপরের দিনগুলো যেন ধীরে ধীরে তাদের সব অহং ভেঙে চুরমার করে দেয়। প্রথমে অদ্রিত শুধু নিজের ঘরে নিজের সঙ্গে কথা বলতো। এখন সে ছাদে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলে। তার হাসি, চোখের চাউনি, এমনকি হাত নাড়ার ভঙ্গিমাতেও এক অদ্ভুত শূন্যতা ভেসে থাকে। পাড়ার মানুষজনও কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকায়। এমনকি অদ্রিতের মা’কে প্রশ্ন করে, “অদ্রিত কি ঠিক আছে?”
এসব বাড়তেই অদ্রিতের বাবা আর দেরি করেন না। সৌরভের সাথে কথা বলে। তার পরিচিত কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকলে খুব গোপনেই তার সাথে যোগাযোগ করতে চান। সৌরভও দায়িত্ব নিয়ে খোঁজ করে তার মেডিকেল কলেজের বন্ধু অরিত্র সাফির। সৌরভের জানা মতে সে এখন মেন্টাল হেলথ ইনস্টিটিউটে কাজ করছে। তাও বছর খানেক হলো। ছেলেটা দারুন। অনেক কষ্টে খুঁজে বের করে অরিত্রকে। অরিত্রের দেখা মিললেই, সামান্য দেরি না করেই পরদিন সকালে সৌরভ হাজির হয় অরিত্রকে নিয়ে নিজের চাচার বাসায়। অরিত্র সাদা পাঞ্জাবী, চোখে মৃদু হাসি আর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নিয়েই অদ্রিতের বাড়িতে পৌছায়। প্রথমে অদ্রিতের বাবা মায়ের সঙ্গে সামান্য কথপোকথন শেষ করে অদ্রিতে ঘরে যায় সৌরভের বন্ধুর পরিচয়ে।
অরিত্রের মতে, “মানুষের মন শুধুমাত্র শরীরের ছায়া নয়। মন নিজেই এক জটিল মহাকাশ। আর আমাদের সব থেকে অবহেলার। যেখানে রোগের চিকিৎসা নেই, অপরাধের শাস্তি নেই…।”
অরিত্রের সঙ্গে খুব অনায়াসেই কথা বলে অদ্রিত। একেবারে খোলা বইয়ের মতো মৃণালিনীকে তুলে ধরে অরিত্রের কাছে। অদ্রিতের সাথে দীর্ঘ কথপোকথনে অরিত্র বুঝতে পারে,একে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সে আরো গুটিয়ে যাবে। সে বোঝে, এই ছেলেটার রক্তের পরীক্ষায় নয়, চিকিৎসা চায় শব্দ দিয়ে, গল্প দিয়ে, সময় আর একাকিত্বের বাঁধ ভেঙ্গে।
অরিত্র শুরু করে এক অন্যরকম চিকিৎসা। সেশন হয় ছাদে, বারান্দায়, বইয়ের পাতা উল্টে… কখনো চা হাতে, কখনো গোধূলি আলোয়। অদ্রিত কথা বলে, অরিত্র শোনে। ধীরে ধীরে অদ্রিতের কাছে মৃণালিনী ঝাপসা হতে থাকে। অদ্রিত তাকে খুব খোঁজে, তবে ছুঁয়েও ছুঁতে পারে না ঠিক। এই কানামাছি খেলায় আস্তে আস্তে মৃণালিনী হারায়। অদ্রিত ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে থাকে।
সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। অদ্রিতের মধ্যে আচমকা পরিবর্তন দেখা যায়। সে যেই মৃণালিনীকে বারংবার দেখতো তার রুপ একেবারে নাই হয়ে যায়। সে আর খুঁজে পায় না তাকে। মৃণালিনী ঠিক এমন ভাবে নিরবে চলে যায়, যেন কখনো ছিলই না। অদ্রিত প্রথম প্রথম খুঁজে না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠলেও একটা সময় সে হয়ে পড়ে শান্ত। আস্তে ধীরে সে নিজেকে হালকা অনুভব করে। সে ভাবে সে বোধহয় এক গভীর ঘুমে ছিল বেশ কয়েকদিন। আর এই ঘুমের সব থেকে সুন্দর স্বপ্ন ছিল মৃণালিনী।
অদ্রিত নিজেই অরিত্রের কাছে বলে, “আমার মনে হয় আমি একটা দীর্ঘ ঘুমে ছিলাম। ঘুমের মধ্যে একটা মেয়েকে দেখেছিলাম… মৃণালিনী…
সে কি সত্যিই ছিল, নাকি ছিল না, জানি না। তবে তার থাকা উচিৎ ছিল।”
অরিত্র মৃদু হেসে বলে, “সব গল্পের শেষ থাকে না, অদ্রিত। কিছু চরিত্র কেবল একটা সময়ের জন্য আসে, তোমাকে একটা দরজা দেখিয়ে দিয়ে হারিয়ে যায়। মৃণালিনী হয়তো তাই-ই ছিল। তোমার অবচেতন মনের বাসনা।”
অদ্রিতের সুস্থতা যেন এক মোহমুক্তি। বাস্তবতার নিঃশ্বাসে ধুলোমলিন হয়ে যায় সব কল্পনার পর্দা। তবে অদ্রিতের সুস্থতা আদৌ কি মুক্তি পায় তার মনের গভীর কামনা থেকে? বারবার সেই একই বই আউরে যায় অদ্রিত। মৃণালিনীকে আরো গভীরভাবে চিনতে চেষ্টা করে, বুঝতে চেষ্টা করে। উপন্যাসিক চরিত্রটা যেন বাস্তবে সেই আগের মতো করে খুব কাছ থেকে পাবার চেষ্টা করে অদ্রিত। তবে তার সুস্থ মস্তিষ্ক আর তাকে সেই কাল্পনিক স্পর্শ দেয় না। সে বারংবার একটা নজর মৃণালিনীকে দেখতে হাপিয়ে ওঠে। তবে কোন গল্পের সমাপ্তিতে যেন মৃণালিনী মিলিয়ে গেছে। অদ্রিত আউড়ে যায় তার নিজের লেখা কয়েক লাইন, “আজ ঘৃণিত নিজ আঁখি সম্মুখে বাঁচিবারে খুঁজিতেছি ঠাঁই।
হারাতে চাই অতল সমুদ্র কিংবা পথহীন পাহাড়ে।
শান্তির পিছে ফেরারি আমি।
এনে দাও সুখ, আরও অনেক সুখ।
মিথ্যে হোক নন্দনতত্ত্ব, মরে যাক বিষাদ!”
অদ্রিত মানুষিক সুস্থতা পেলেও তার নিঃসঙ্গতার মুক্তি কোথায়? যে যেই একাকিত্বের গোলক ধাঁধায় আঁটকে গেছে তার পথের সীমানা কোথায়?
কিছু দিন পেরোতেই সৌরভ হাজির হয় অরিত্রের চেম্বারে। বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ শুধু কারন নয়, সে জানতে এসেছে অনেক সমাধান। সৌরভ এক প্রশ্ন তুলে দেয় অরিত্রের কাছে, “মৃণালিনী তবে কি কেবল এক মায়া?”
অরিত্র এবার আর কোনো আবেগে ভেসে যান না। তার কণ্ঠে ছিল শুষ্ক কিন্তু স্থির, সে বলল, “মৃণালিনী ছিল অদ্রিতের একাকীত্বের অবচেতন প্রতিচ্ছবি। সে এমন এক মানসিক স্তরে পৌঁছেছিল, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের মানসিক শূন্যতা পূরণ করতে গড়ে তোলে আরেকটি অস্তিত্ব। এটা একধরনের ডিপারসোনালাইজেশন ডিসঅর্ডার, যার এক শাখা হলো হ্যালুসিনেটরি সাইকোসিস। মানসিক বিষণ্ণতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিঃসঙ্গতা যখন তীব্র রূপ নেয়, তখন মস্তিষ্ক আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে কল্পিত কোনো মানুষ বা সত্তার জন্ম দেয়। বাস্তবতাকে ধারণ করার মতো শক্তি যখন দুর্বল হয়ে যায়, মানুষ তখন অবাস্তবকে বাস্তব ভাবতে শুরু করে। এমন মানসিক অবস্থাকে আধুনিক মনোরোগ চিকিৎসায় বলা হয় Derealization এবং Depersonalization Disorder (DPDR)। এটি মূলত একধরনের সাইকো-নিউরোলজিকাল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সর্বশেষ গবেষণাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৬.৮% মানুষ কোনো না কোনোভাবে DPDR-এর প্রাথমিক লক্ষণ বহন করেন। যদিও এর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, অধিকাংশ মানুষই এই ধরনের অভিজ্ঞতাকে গোপন রাখেন, বা একে মানসিক রোগ বলেই মেনে নিতে চান না।”
অরিত্র একটু থেমে আবার বলে, “এই অবস্থা প্রায়শই শুরু হয় প্রি-স্টেজ সিম্পটম দিয়ে। নির্জন জীবন, কারো সাথে গভীরভাবে মিশতে না পারা, হঠাৎ নিজের ছায়াকেও অপরিচিত মনে হওয়া। এমনকি কেউ কেউ অনুভব করেন যেন কেউ তাদের পাশে আছে, অথচ বাস্তবে কেউ নেই। অনেকে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলতে থাকে, নিজেই নিজের হাজারটা চরিত্র তৈরি করতে থাকে। তার জীবনে যে সকল জিনিস কখনোই হবে না সে জানে, তেমন অবাস্তব কল্পনা করতে থাকে। এবং তাদের মস্তিষ্ক এমন ভাবে তৈরি হয়ে যায়, যেন তারা কথার জবাব পাচ্ছে। আর এভাবেই তাদের মস্তিষ্ক শান্তি অনুভব করতে থাকে। এটা নেশা হয়ে দাঁড়ায় ।
অদ্রিতও সেই পথেই হেঁটেছিল। আমার ধারণা মতে, তার প্রথম সিম্পটমস গুলো এরকমই ছিল। নিঃসঙ্গতা, কারো সঙ্গে না মেশা, নিজেই নিজের জগৎ তৈরি করে নেওয়া, নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলা। আর সর্বশেষ সে বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়ে তুলেছিল এক মানসিক সঙ্গী মৃণালিনীকে। বলতে পারিস মৃণালিনী ছিল অদ্রিতের একাকীত্বের নিস্তব্ধ চিৎকার, যার প্রতিধ্বনি শুনতে পায়নি কেউ। আর এটাই ধীরে ধীরে চরম পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছিল।”
সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে, “এ