Skip to Content

হৃদ্যতা

December 31, 2025 by
হৃদ্যতা
Mukto Vabuk
| No comments yet

‎#অক্ষরপ্রীতি_পরিবার_অনুগল্প_প্রতীযোগীতা

‎#অনুগল্প_হৃদ্যতা


‎#তিথী_খান

‎'সুখ' কী?

‎দার্শনিকদের মতে, "অন্তঃকরণ,কায়া ও সত্তার সামঞ্জস্যে যে প্রশান্তি আসে, সেটাই সুখ।"

‎একটা ৫ বছর বয়সি শিশুর জন্য এই সংগা একটু বেশিই জটিল হয়ে গেলো নয় কি? সে তো এখনও এক টুকরো শিশির কনা। নির্মল, কোমল, পবিত্র এক সতেজতার প্রতীক। ওয়াজিফার জন্য সে একঝুড়ি ফুলকুঁড়ি। যার সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করতে চায় ওই ঝুড়িটুকুর ভেতরে। বাইরে যে ভীষন দুঃসহতা। এই ছোট্ট ফুলকুড়িকে তার আগলে রাখতে হবে। ঘাড়ে যে ভীষণ গুরুদায়িত্ব তার। 

‎ছোট্ট ফুলকুড়িটাও বুঝি বড় হতে শুরু করে দিয়েছে। হলো না বৈকি? আপাকে যে আজ ভারী কঠিন প্রশ্ন করে বসল। সুখ কী? এই প্রশ্নের উত্তর কী দেবে ওয়াজিফা?

‎"বহমান তরঙ্গের স্রোতে ভেসে বেড়ানো সুখ? নাকি কাল,ভেদ,অবস্থান, পরিস্থিতির উপরে কোনো অভিযোগ না রাখা, এটা সুখ?

‎মুচকি হেসে ছোট্ট বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল ওয়াজিফা, 

‎" আমি, তুই আর মা,আমরা তিনজন যখন একসাথে থাকি সেটাই সুখ। যখন আমরা একটা রুটি তিনজন ভাগ করে খাই সেটাই সুখ। মা যখন আমাদের ভালোবাসে,যত্ন করে মাথায় হাত বুলিয়ে চাঁদের বুড়ির গল্প শোনায় সেটাই সুখ রে বনু।"

‎ছোট্ট জাইফাটা হয়তো এখনও বোঝেনি। তাইতো তার আপাকে আবার প্রশ্ন করলো, 

‎" মা তো এখন আমাদের সাথে নাই আপা,তাহলে তো এখন আমরা সুখী নই। মা কবে আসবে আপা? মাকে ছাড়া আমার একটুও ভালো লাগছে না। পেটে অনেক ক্ষুধা রে আপা। যেদিন থেকে মা চলে গেছে সেদিন থেকে পেট ভরে খেতে পারিনা। আমার পেটের ভেতরে বাবুই পাখিটা খালি কিচিরমিচির করে রে আপা।"

‎ছোট্ট বোনটির কথায় বুকের ভেতর ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে ওয়াজিফার। ইট ভাঙ্গার মতো করে। তার মাকে দেখেছিলো ইট ভাঙ্গার কাজ করতে। একটা আস্ত ইটের উপর যখন হাতুরের বাড়ি পরে সেটা দুখণ্ড হয়ে যায়। এরপর দু'টো থেকে চারটা,চারটা থেকে ছয়টা। তারপর হতেই থাকে। ওয়াজিফার ভেতরটাও সেভাবেই টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। 

‎কিন্তু তার যে কান্না করা বারণ। সে বড় হয়েছে না? সে যদি নিজেকে না সামলায় তাহলে তার ফুলকুড়িকে কে সামলাবে?

‎প্যান্টের ভাজ থেকে একটা লজেন্স বের করে জাইফা। খোসার উপর থেকেই দাঁত বসিয়ে দেয় তার উপর। দু’ভাগ করতে গিয়ে অসংখ্য ছোটছোট খন্ড করে ফেলে। তা থেকেই সমান দুটো ভাগ করে এক ভাগ ওয়াজিফাকে দেয়, " আপা অর্ধেকটা তুমি নাও।"

‎লজেন্সের টুকরো গুলোর দিকে তাকিয়ে চোখদুটো ছলছল করে ওঠে ওয়াজিফার। শুকনো এক ঢোক গিলে কষ্ট টুকু গিলে নেয়," আমি খাবো না বনু,তুই খা। " 

‎জাইফার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে নিলো ওয়াজিফা। শুয়ে পড়ল পিচঢালা রাস্তার পাশে। মাথার উপরে তারাভরা আকাশ।

‎ " মা খুব তারাতাড়ি ফিরে আসবে রে। আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসবে। আজকের মতো ঘুমিয়ে যা,মা ফিরে আসলে আমাদের আর খালি পেট নিয়ে ঘুমাতে হবে না।"

‎কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে জাইফা। সে কী আর জানে দুনিয়া কতটা দুরূহ! তার চোখে দুনিয়া কেমন ঘুরতে থাকা গাড়ির চাকার মতো। শুধুই ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে সকাল হয় আবার রাত হয়।ওয়াজিফা জানে, এই দুনিয়া কতটা নির্মম। তার কাছে দুনিয়া হলো, 

‎" খসখসে মাটির উপরে আঁকা এক অসমাপ্ত চিত্র। "

‎আজ পাঁচদিন হলো,তাদের ঘরে খাবার নেই। বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারায় সংযোগ কেটে দিয়েছে। বাড়িওয়ালা রোজ দু'বার করে এসে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে ঘরভাড়ার। এক মুদি দোকানদারের কাছ থেকে মেয়াদোত্তীর্ন হওয়া রুটি- বিস্কুট এনে দু'বোন খেয়ে দিন পার করছে। শুধু একটাই আশা মা ফিরবে। 

‎সীমান্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে কতশত অভিযোগ করছে ওয়াজিফা আল্লাহর কাছে। আল্লাহ কি শুনেন না? তাদের কষ্ট দেখেন না? মা তো বলেছে অসহায়দের ডাক নাকি আল্লাহ ফেরান না,তাহলে ওয়াজিফার দোয়া কবুল হয় না কেনো? তার এত কষ্ট কেনো? আল্লাহ তার বাবাকে নিয়ে গেলেন মায়ের কাঁধে একবোঝা ঋনের বস্তা চাপিয়ে। তা শোধ করার তাগিদে তার মাও হারিয়ে যাওয়ার পথে। আজ পাঁচদিন ধরে ফেরে না সে। তার কি ওয়াজিফার কথা একটুও মনে পড়ে না? জাইফার জন্য চিন্তা হয়না তার? সবাই স্বার্থপর! এই দুনিয়ার সবাই স্বার্থপর..!

‎দশ দিন পার হয়ে যাওয়ার পরেও ওয়াজিহার মা ফেরেননি। এগার দিনের মাথায় জাইফার তীব্র জ্বর এলো। জাইফা শুধু মাকে ডাকে। আর কিসব আবোল তাবোল বলে, " আপারে আমার অনেক কষ্ট হইতাছে আপা। আমি কি আর বাঁচব না আপা?"

‎ওয়াজিফার মনে হচ্ছিল তার শরীরে কেউ ছুড়ি চালাচ্ছে। এত কষ্ট কেনো হচ্ছে তার। গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে বসে আছে। এত ঢোক গিলছে তবুও ভেতরে যাচ্ছে না সেটা। জোঁকের মতো লেগে রয়েছে এটা। কি মুসকিল! ছোট্ট জাইফার আদুরে মুখখানায় দু'টো চুমু খায় ওয়াজিফা। ছটফট করে ওঠে,

‎" কিছু হবে না তোর বনু। আপা আছি তো। তুই ভালো হয়ে যাবি। আল্লাহ রে ডাক। আল্লাহ তোরে ভালো করে দেবেন।"

‎ কেমন চুপ করে থাকে জাইফা। কথা বলে না। ব্যাথায় আর্তনাদ করে না। ওয়াজিফা উন্মাদের মতো করে ওঠে,

‎" ও আল্লাহ আমার বনু কথা বলে না কেনো আল্লাহ? কে আছো আমার ফুলকুড়ি রে বাঁচাও। আল্লাহ,আল্লাহ গো। আমার কেউ নাই আল্লাহ,আমার ফুলকুড়ি রে তুমি নিয়া যাইও না আল্লাহ।"

‎সেদিন জাইফাও বোধহয় ওয়াজিফার সাথে একটু বেইমানি করে । বড় আপার কথা একবারও ভাবেনি। বড্ড রাগ হচ্ছে ওয়াজিফার,এই ছোট্ট ফুলকুড়ি টা কি আজ বেয়াদব হয়ে গেলো। বড় আপার কথা শুনছে না। এই যে ওয়াজিফা ডাকছে তাকে, তবুও সাড়া দিচ্ছে না। এত বেয়াদব হয়ে গেলো তার ছোট্ট বোনটা?

‎" বনু রে ওঠ, তোর আপা রে একা রাইখা যাবি? আপার যে তুই ছাড়া কেউ নাই। কিরে উঠবি না? আপার লগে খেলবি না? আপা কিন্তু অনেক রাগ করমু।"

‎ উঠলো না জাইফা। সে কি আজ সুখের দেখা পেলো তবে ?প্রকৃত সুখ? আজকের পরে জাইফার আর ক্ষুধা লাগবে না। তার পেটের ভেতরের বাবুই পাখিটা কিচিরমিচির করবে না আর? সে আর মায়ের জন্য কাঁদবে না?আপার কাছে দুনিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে আর বিভ্রান্ত করবে না?ছোট্ট বেইমানি ফুলকুড়িটা চলে যায় দুনিয়ার সুখের মায়া ত্যাগ করে। 

‎ওয়াজিফার বিশ্বাস হয় না এসব কিছু। কেমন স্বপ্নের মতো লাগে। সেদিন আরোও একটা কথা বুঝতে পারে সে,

‎" কখনও কখনও মুক্তি দেওয়ার নাম ও সুখ।" 

‎পরের দিন সকালে ওয়াজিফার মাকে পাওয়া যায় রেললাইনের ধারে। কি আশ্চর্য! মা-ও যে তার সাথে কথা বলছে না। জাইফার মতোই চুপ করে রয়েছে। তারা দুজন কি ওয়াজিফার সাথে অভিমান করল? দুজন মিলে চুক্তি করেছে ওয়াজিফাকে নিঃস্ব করে চলে যাওয়ার। এই গোলকধাঁধার পৃথিবীতে ওয়াজিফার আর কেউ রইলো না। শুধু সে,আর সে,কেবলই সে। এক বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের ন্যায়, শেকড় থেকে আলাদা হওয়া এক ঝড়া পাতা, এক পরিত্যাক্ত স্কুলের শেষ ঘন্টার মতো।

‎~ সমাপ্ত~: 

হৃদ্যতা
Mukto Vabuk December 31, 2025
Share this post
Tags
Archive
Sign in to leave a comment